উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে ব্যাংকগুলোতে আমানত কমলেও বাড়ছে ঋণ বিতরণ। তবে বিনিয়োগ মন্দার কারণে শিল্প খাতে বা বেসরকারি খাতে বাড়ছে না ঋণের চাহিদা। বরং ভোক্তাঋণের চাহিদা বাড়ছে, যার মূল অংশই যাচ্ছে আবাসন বা গৃহঋণে। অন্য খাতের তুলনায় এই খাতে ঋণের সুদহার তুলনামূলক কম বাড়ায় গ্রাহকের চাহিদাও বাড়ছে।
নগরায়ণের প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে নিজের একটি স্থায়ী ঠিকানা যেন প্রত্যেক মানুষের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন কেউ একা বাস্তবায়ন করতে পারে না। সে জন্য সরকারি খাতে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন এবং বেসরকারি খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে।
বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা, নির্মাণ বা সংস্কার করার জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া এক ধরনের সুরক্ষিত ঋণই হলো গৃহঋণ, যেখানে গ্রহীতাকে সম্পত্তি জামানত হিসেবে বন্ধক রাখতে হয়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীরা সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অল্প সুদে গৃহঋণ নিতে পারেন। তাদের জন্য এই সুযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি)। বেসরকারি ব্যাংক থেকেও এই ঋণ নেওয়া যায়। এই ঋণ দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়।
সরকারি খাতে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন গত অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ৩ কোটি টাকার গৃহঋণ অনুমোদন করে। তবে বিতরণ করেছে ৯২১ কোটি টাকা, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ৯১২ কোটি টাকার বেশি।
এদিকে, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। যেখানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঋণ বিতরণ হয়েছে ভোক্তাঋণে। তথ্য বলছে, গত জুন শেষে ভোক্তাঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। বাড়ি বা ফ্ল্যাট, গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, এসি অর্থাৎ বিলাসবহুল পণ্য কেনার জন্যই বেশি ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো।
রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে নিজের আবাসন থাকবে- এমন স্বপ্নই সবাই দেখেন। অনেকে সারা জীবন এই শহরে থেকেও নিজের আবাসন তৈরি করতে পারেন না। জমি ও ফ্ল্যাটের দাম, ঋণের সুদ- এসব কারণে নিজেদের ফ্ল্যাট বা বাড়ি করা প্রকৃত অর্থেই অনেক কঠিন। এককভাবে বেশির ভাগ মানুষ সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন না। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য তাই গৃহঋণের বিকল্প নেই। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে; দিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ঋণসুবিধা।
ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গৃহঋণকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, নিরাপদ ও গ্রাহকবান্ধব পণ্য হিসেবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে থাকে। এই খাতে ঋণ বিতরণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবাসনচাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। গৃহঋণের আওতায় নতুন বা পুরোনো ফ্ল্যাট/বাড়ি কেনা, নির্মাণ, সংস্কার, সম্প্রসারণ এবং কটেজ কেনার জন্য বিভিন্ন ধরনের ঋণ বিতরণ করা হয়। অর্থাৎ নতুন বাড়ি তৈরি বা ফ্ল্যাট/প্লটসহ তৈরি বাড়ি কেনার জন্য ঋণ দেয় ব্যাংকগুলো। পুরোনো বাড়ি মেরামত বা সংস্কারের জন্যেও গৃহঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া, জমি কিনে তারপর সেই জমিতে বাড়ি নির্মাণের জন্যও এই ঋণ দেওয়া হয়। এসব খাতে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো সহজ শর্তে এবং তুলনামূলক কম সুদে গৃহঋণ দিয়ে থাকে।
গ্রাহকের আয়, বয়স, কর্মসংস্থানের ধরন ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে যোগ্যতা নির্ধারণ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ঋণের পরিমাণ সর্বনিম্ন ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা এবং সর্বোচ্চ মেয়াদ ২৫ বছর পর্যন্ত দিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রে সুদের হার ক্ষেত্রবিশেষে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া হয়। গ্রাহকের চাহিদার ভিত্তিতে ৭০: ৩০ অনুপাতে ঋণ বিতরণ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। অর্থাৎ বাড়ি, জমি বা ফ্ল্যাটের মূল্য যদি এক কোটি টাকা হয় তাহলে ব্যাংক থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে সর্বনিম্ন ১০ দিনের বা বিশেষ পরিস্থিতিতে এর চেয়েও কম সময়ের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।
এ বিষয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমানে অন্য ঋণের চাহিদা না থাকলেও গৃহঋণের চাহিদা বাড়ছে। গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে ব্যাংকগুলোও এগিয়ে আসছে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করছে।’ তিনি বলেন, ‘মার্কেন্টাইল ব্যাংক গৃহঋণকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, নিরাপদ ও গ্রাহকবান্ধব পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। ব্যাংকটির লক্ষ্য হলো মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবাসন চাহিদা পূরণ করা এবং আবাসন খাতের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা।’
একই বিষয়ে প্রাইম ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নাজিম এ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর একটি হচ্ছে বাসস্থান। প্রাইম ব্যাংক মানুষের এ চাহিদা পূরণে গ্রাহকদের গৃহঋণ বা হোম লোন দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রাইম ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য ঋণ প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব সহজ এবং দ্রুততর করতে সচেষ্ট। আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং প্রশিক্ষিত কর্মীরা ন্যূনতম কাগজপত্র নিয়ে দ্রুত ঋণ অনুমোদনের সুবিধা দিয়ে গ্রাহকদের সহায়তা করেন, যার ফলে গ্রাহক ঝামেলামুক্তভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঋণসুবিধা গ্রহণ করতে পারেন। তবে গৃহঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়মিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া রয়েছে। এ প্রক্রিয়া গ্রাহক ও ব্যাংক উভয়ের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গৃহঋণ শুধুই একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত এক ধরনের দায়বদ্ধতা। এটি একদিকে গ্রাহকের স্বপ্ন পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলো বর্তমান বিনিয়োগশূন্য পরিস্থিতিতে এই খাতে বিনিয়োগ করে যা আয় করছে, তা দিয়ে গ্রাহকদের মুনাফা দিচ্ছে। তারা বলেন, ‘গৃহঋণ শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণ করছে না, এটি দেশের আবাসন খাত এবং নির্মাণ খাতকে শক্তিশালী করছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে ও নগরায়ণ আরও গতিশীল করছে। তবে তারা সতর্ক করছেন, ঋণ নেওয়ার আগে বাজার পরিস্থিতি, সুদ হার ও ব্যক্তিগত আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা আবশ্যক।’
এ প্রসঙ্গে গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে নতুন করে বিনিয়োগ খুব একটা হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতিও সেই অর্থে কমছে না। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও স্থিতিশীল নয়। এখন তো আমানতের সুদের হারও কিছুটা বেড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোকে তাদের বিনিয়োগ না বাড়িয়ে উপায় নেই। এ কারণে ব্যাংকগুলো ভোক্তাঋণে ঝুঁকছে। এর মধ্যে উচ্চবিত্ত শ্রেণি বা উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের জীবনমান বাড়ানোর জন্য ঋণের দিকে ঝুঁকছে। ব্যাংকগুলোও তাদের ঋণ দিচ্ছে। যদিও সত্যিকার অর্থে এগুলো উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নয়। তবে ব্যাংকগুলোর তো আয় করতে হবে। আয় না করতে পারলে তো গ্রাহকদের মুনাফা দিতে পারবে না। তাই ব্যাংকগুলো সেদিকেই আগ্রহী হচ্ছে।’
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাড়ি কেনার জন্য গত তিন মাসে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৬ হাজার কোটির টাকারও বেশি। চলতি বছরের মার্চ শেষে এই খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৩ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত এই খাতের বিতরণকৃত ঋণ ছিল এক লাখ ২৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসেই এই খাতের ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২ হাজার ৮৫ কোটি টাকা