সাহসী ও প্রতিবাদী এক নারীর নাম মনীষা চক্রবর্তী (২৯)। নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন। বরিশালের শ্রমজীবী মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘দিদি’ বা ‘গরিবের ডাক্তার’ নামে। মেডিকেলে লেখাপড়া শেষ করে ৩৪তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সহকারী সার্জন পদে নিয়োগ পেলেও সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি। চিকিৎসক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার বদলে তিনি বেছে নিয়েছেন প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পথ।
বরিশালে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মনীষা বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে ছাত্রজীবনেই যুক্ত হন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) রাজনীতিতে। বর্তমানে তিনি বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সদস্যসচিব। নারীর প্রতি সহিংসতা, সন্ত্রাস, দখলদারত্ব ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি সক্রিয়। আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে হামলা, মামলার শিকার হয়েছেন। কারাভোগও করতে হয়েছে তাকে। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রথম নারী মেয়র প্রার্থী হিসেবেও লড়েছেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বরিশাল জেলার একমাত্র নারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন ডা. মনীষা চক্রবর্তী। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক মঈনুল ইসলাম সবুজ।
খবরের কাগজ: আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ কেমন ছিল?
মনীষা চক্রবর্তী: ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আমাদের বাসায় প্রগতিশীল মানুষের আনাগোনা। বরিশালের ভাষা আন্দোলনের নেত্রী ও স্বরস্বতী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রানী ভট্টাচার্য আমাদের পাশের বাসায় থাকতেন। বাসায় নিয়মিত বামপন্থি ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের আড্ডা বসত। বই ছিল প্রচুর। সেই পরিবেশ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে ভাবনার বীজ তখনই বোনা হয়। দেখতে দেখতে বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি।
খবরের কাগজ: সমাজ পরিবর্তনের প্রেরণা কোথা থেকে পেলেন?
মনীষা চক্রবর্তী: ছোটবেলা থেকেই প্রগতিশীল প্রকাশনার বই পড়তাম। সমরেশ মজুমদারের লেখালেখিও প্রভাব ফেলেছে। তবে সংগঠিতভাবে সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখার শক্তি পাই বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর। সেখানে বুঝতে শিখেছি, ব্যক্তিগত আবেগ নয়, সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। সেখান থেকেই নিয়মিত আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত হওয়া।
খবরের কাগজ: প্রথম কোন আন্দোলনে অংশ নেন?
মনীষা চক্রবর্তী: ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির বিরুদ্ধে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকা লং মার্চে অংশ নিই। সেটিই আমার প্রথম বড় আন্দোলন। এরপর জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্ত থেকেছি। ছাত্রজীবনে সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলাম।
খবরের কাগজ: সংগ্রামে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
মনীষা চক্রবর্তী: পুঁজিবাদী সমাজের প্রবল স্রোতের বিরুদ্ধে রাজনীতি করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। মূলধারার বাইরে দাঁড়িয়ে বিকল্প রাজনীতি করা সহজ নয়। সংগঠন ধরে রাখা, কর্মীদের অনুপ্রাণিত রাখা–সবই কঠিন। নারীদের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। সামাজিক পূর্বধারণা ও কাঠামোগত বৈষম্য তাদের পথকে কঠিন করে তোলে।
খবরের কাগজ: নারী হিসেবে কী ধরনের বাধার মুখোমুখি হয়েছেন?
মনীষা চক্রবর্তী: আমাদের সমাজে নারীদের চলার পথ এখনো কণ্টকাকীর্ণ। পরিবার ও সমাজ–দুই জায়গা থেকেই প্রশ্ন ও চাপ থাকে। রাজনীতিতে নারীদের সক্ষমতা নিয়ে অনেকে সংশয় পোষণ করেন। কিন্তু আমি মনে করি, নারীরা যদি টিকে থাকতে পারেন, তাহলে তারাই অন্য নারীদের জন্য পথ তৈরি করেন। নিজের স্বাধীন সত্তা তৈরি করা এবং সংগ্রামে দৃঢ় থাকা, এটাই সবচেয়ে জরুরি।
খবরের কাগজ: নিজের অবদান বা অর্জন কীভাবে দেখেন?
মনীষা চক্রবর্তী: ব্যক্তিগত অর্জনের কথা ভাবি না। রাজনীতি একক সাফল্যের জায়গা নয়। বরং নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি–শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছি। তাদের বিশ্বাস অর্জন করে পাশে থাকতে পারা–এটাই আমার প্রাপ্তি।
খবরের কাগজ: হামলা বা হুমকির মুখে পড়েছেন?
মনীষা চক্রবর্তী: বিভিন্ন সময়ে হামলার শিকার হয়েছি। ২০১৮ সালে ব্যাটারিচালিত রিকশার লাইসেন্সের দাবিতে আন্দোলনের সময় আমাদের মারধর করে জেলে পাঠানো হয়, বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দেওয়া হয়, যা এখনো চলমান। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট কারচুপি ধরার পরও হামলার শিকার হয়েছি। ডিসি লেক ঘিরে দেয়াল নির্মাণের প্রতিবাদে সামাজিক আন্দোলন গড়ার সময়ও প্রশাসনিক চাপ এসেছে। এগুলোকে রাজনীতিরই অংশ হিসেবে দেখি।
খবরের কাগজ: আজকের নারীদের জন্য বার্তা কী?
মনীষা চক্রবর্তী: আমরা এমন দেশের মানুষ, যেখানে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, মনোরমা বসুর মতো নারীরা সংগ্রামের ইতিহাস তৈরি করেছেন। তাদের দেখানো পথ আমাদের অনুপ্রেরণা। বাধা ও সংকট থাকবে, কিন্তু তার মধ্য থেকেই এগিয়ে যাওয়ার সাহস তৈরি করতে হবে।
খবরের কাগজ: সহযোদ্ধাদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
মনীষা চক্রবর্তী: কোনো আন্দোলন একা হয় না। ব্যক্তি সামনে এলেও পেছনে থাকে একটি সংগঠিত দল। রাজনীতি মূলত টিমওয়ার্ক। অনেকের নাম সামনে আসে না, কিন্তু তাদের শ্রম ও ত্যাগ ছাড়া কোনো আন্দোলন সফল হয় না।
খবরের কাগজ: আগামী দিনের লক্ষ্য কী?
মনীষা চক্রবর্তী: আমাদের লক্ষ্য–সমাজ পরিবর্তনের জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তোলা। বাংলাদেশে বারবার অভ্যুত্থান হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি; কারণ সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয়নি। আমরা সেই শক্তি গড়তে চাই। নারীবান্ধব ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করতে চাই। নতুন প্রজন্ম যেন পুরোনো বদ্ধ রাজনৈতিক বলয়ে আটকে না থেকে নতুন ধারার রাজনীতি নির্মাণে এগিয়ে আসে, সেটাই আমরা চাই।
খবরের কাগজ: ব্যক্তিজীবন নিয়ে পরিকল্পনা?
মনীষা চক্রবর্তী: জীবনকে ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ করতে চাই না। বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবার নিয়েই পথ চলতে চাই।