পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ পাহাড়ি-বাঙালি বহুভাষী মানুষের সহাবস্থান। এই জনপদে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন মানে প্রতিদিনই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। খাগড়াছড়ি পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৩০তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা সাজিয়া তাহের। পাহাড়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে, আস্থার ঘাটতি সামলে, উন্নয়নের প্রশ্নে ভারসাম্য রক্ষা করাই তার নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আগে তার সঙ্গে কথা বলেছেন খবরের কাগজের খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি দিদারুল আলম রাজু।
খবরের কাগজ: এ রকম চ্যালেঞ্জিং পেশায় পরিবারের সমর্থন খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কেমন সহযোগিতা পান?
সাজিয়া তাহের: শিক্ষানুরাগী ও মূল্যবোধসম্পন্ন পরিবারে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। আমার বাবা একজন সরকারি চাকরিজীবী এবং মা গৃহিণী। আমরা তিন বোন, আমার বড় বোন চিকিৎসক, ছোট জন একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। পরিবার আমাদের সব সময় সততা, পরিশ্রম ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছে। আমার স্বামী মূর্তজা হাসান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। মেইনটেন্যান্স ম্যানেজার হিসেবে বর্তমানে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে কর্মরত আছেন। আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে ক্লাস ফাইভ এবং ছোট জন নার্সারিতে পড়ছে। পরিবারের সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা আমাকে সব সময় কাজে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে।
খবরের কাগজ: কর্মজীবনে আপনার দক্ষতার প্রথম সোপান কোনটি?
সাজিয়া তাহের: আমি সব সময় অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে গেছি। চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিকে সম্মিলিত মেধা তালিকার দ্বিতীয় এবং উচ্চমাধ্যমিকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম স্থান অধিকার করি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতোকোত্তর সম্পন্ন করেছি। পরে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনপ্রশাসন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করি, যা প্রাশাসনিক কাজে আমাকে দক্ষ ও বাস্তবমুখী করতে দারুণভাবে সহায়তা করেছে। আমি মনে করি কর্মজীবনে দক্ষতা অর্জনের প্রথম সোপান হিসেবে এটি কাজ করেছে।
খবরের কাগজ: আপনার প্রশাসনে আসার প্রেরণা কী?
সাজিয়া তাহের: দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার তীব্র অভিপ্রায় থেকেই আমার প্রশাসনে আসা। তবে আমার বাবারও খুব ইচ্ছা ছিল আমাকে প্রশাসন ক্যাডারে দেখার। জনপ্রশাসনের চাকরি খুবই বৈচিত্র্যময় ও চ্যালেঞ্জিং। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালনের সময় অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে, যা আমাকে প্রশাসনে স্থায়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
খবরের কাগজ: পরিবার ও ক্যারিয়ারের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করেন?
সাজিয়া তাহের: জনপ্রশাসনে চাকরি করে পরিবার এবং পেশার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা মোটেও সহজ নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, পরিবারের সমর্থন এবং সময় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি সম্ভব। আমি চেষ্টা করি দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে।
খবরের কাগজ: পাহাড়ি অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে কি না?
সাজিয়া তাহের: পাহাড়ি অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে দুর্গম। এখানে যোগাযোগব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে এই চ্যালেঞ্জগুলো অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। আমিও তাই করে চলেছি।
খবরের কাগজ: রাজনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় কী ধরনের চাপ আসে?
খবরের কাগজ: প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন সময়ে চাপ আসে। তবে আইন ও নীতিমালার আলোকে নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াই আমার মূলনীতি।
খবরের কাগজ: প্রশাসনে কাজ করতে গিয়ে নারী কর্মকর্তা হিসেবে অভিজ্ঞতা কেমন?
সাজিয়া তাহের: কখনো কখনো নারী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার অতিরিক্ত চাপ থাকে। তবে এটিকে আমি বাধা নয়, বরং নিজের সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে দেখি।
খবরের কাগজ: খাগড়াছড়ি পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন এবং নতুন কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি না?
সাজিয়া তাহের: খাগড়াছড়ি পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নাগরিক সেবা সহজীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এখানকার নাগরিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সেবা পেতে সময়ক্ষেপণ ও তথ্যের ঘাটতি। এ জন্য আমরা ডিজিটাল সেবা চালু, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা জোরদার এবং নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
খবরের কাগজ: প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
সাজিয়া তাহের: প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন। তবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ, নিরাপদ কর্মপরিসর এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নারীরা শুধু সহানুভূতিশীল নয়, বরং দক্ষ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এবং নেতৃত্বদানে সমানভাবে পারদর্শী। এটা আজ প্রমাণিত সত্য।
খবরের কাগজ: মেধাবী তরুণী এবং নারীদের প্রতি কোনো পরামর্শ আছে কি না?
সাজিয়া তাহের: মেধাবী তরুণী ও নারীদের প্রতি আমার বার্তা হলো, নিজের সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখুন। চ্যালেঞ্জকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করুন, পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করুন। প্রচলিত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস থাকতে হবে।
খবরের কাগজ: আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
সাজিয়া তাহের: আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমার কাছে কেবল একটি প্রতীকী দিবস নয়। এটি নারীদের সম্মান ও সমঅধিকারের বাস্তব অগ্রগতির মূল্যায়নের দিন। এই দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ‘নারীর ক্ষমতায়ন মানে পুরো সমাজের অগ্রগতি’।