২৬ মার্চ–বাঙালি জাতির মহান স্বাধীনতা দিবস। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ও গৌরবময় অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাঙালির অর্জনের ইতিহাসে যতটুকু দেখা যায়, স্বাধীনতা বলে এই জাতির কোনো দিক চিহ্ন ছিল না। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে শেষ স্বাধীন নবাব বলে আলোচনায় রেখেছেন কোনো কোনো ঐতিহাসিক–আমি মনে করি সেটা যথাযথ নয়। কারণ মুর্শিদাবাদের নবাবরা স্বাধীন ছিলেন না, তারা মোঘলদের কর দিয়ে নবাবি টিকিয়ে রাখতেন।
প্রসাদ ষড়যন্ত্রে একবার সিরাজউদ্দৌলার খালাতো ভাই (খালা ঘসেটি বেগমের পালিত পুত্র) শওকত জংয়ের (ইকরামউদ্দৌলা) নামে সনদ এনে দেয় জগৎশেঠ নামের এক ধনকুব। সেই কারণে নবাবির সনদ নিয়ে দুই ভাইয়ের যুদ্ধ বেঁধে যায়। জগৎশেঠ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দিল্লি থেকে শওকত জংয়ের নামে সনদ নিয়ে এলে শওকত জং নিজেকে নবাব ঘোষণা করেন। তখনই মোহনলালের নেতৃত্বে সিরাজউদ্দৌলার সেনারা আক্রমণ করে শওকত জংকে। যুদ্ধে শওকত জং নিহত হয়।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। আমাদের তথাকথিত স্বাধীনতা। ১৯৪৭ সালে আমরা নামকাওয়াস্তে স্বাধীনতা পাই। রাষ্ট্রের সব কর্তৃত্ব ছিল পশ্চিমাদের হাতে। সবকিছুতে ছিল এবং বৈষম্য। সেনাবাহিনীর পদে বাঙালিরা মেজরের চেয়ে বড় পদে যাওয়ার সুযোগ পেত না। ক্যাডার সার্ভিসেও একই অবস্থা। নানাভাবে তারা বাঙালিদের দমিয়ে রাখত। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে শেরেবাংলার এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করলেও ক্ষমতা বেশি দিন টিকিয়ে রাখতে পারেননি। ভারতীয় চর আখ্যা দিয়ে শেরেবাংলার মন্ত্রী পরিষদকে বাতিল ঘোষণা করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পরিষদ। এত অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে একজনই প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ১৯৬৬ সালে তিনি ছয় দফা ঘোষণা করেন এবং ছয় দফা দাবি আদায়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। সেই ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ সময়ে তার স্থায়ী আবাস গড়ে ওঠে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। কারাগারে তিনি আগেও গিয়েছিলেন। তার জীবনের দীর্ঘসময় কেটেছে কারাগারে। সেই মহান মানুষটির নাম শেখ মুজিবুর রহমান। যাকে ১৯৬৯ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র-জনতা কারাগার থেকে মুক্ত করে। রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় লাখ লাখ ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক তোফায়েল আহমেদ তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে উপস্থিত ছাত্র-জনতা। সেই থেকে তিনি আমাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধু। অভাগা বাঙালি জাতির সৌভাগ্য যে, অবহেলিত এ ভূখণ্ডে শেখ মুজিব নামে একজন মহান মানুষের জন্ম হয়েছিল। সে মানুষটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছে। স্বাধীনতার জন্য উজ্জীবিত করেছে। সাহস জুগিয়েছে।
পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা মুখে মুসলমান ভাই ভাই বললেও, সবই ছিল তাদের ভাঁওতাবাজি। কার্যত তারা বাঙালিদের খাঁটি মুসলমান ভাবত না। বাঙালিদের তারা অর্ধেক মুসলমান অর্ধেক হিন্দু বলে ঠাট্টা করত। তারা দমনপীড়নের মাধ্যমে বাঙালিদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করত। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ক্ষমতা সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে দিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যান। জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে বললেন, তিনি দেশে সাধারণ নির্বাচন দেবেন। গণতন্ত্র দেবেন। তারপর ১৯৭০ সালে নির্বাচনের ব্যাপারে জেনারেল ইয়াহিয়া এ পর্যন্ত কথা রাখলেন। নির্বাচন হলো। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে অংশ নিলেন। সে সময়ে আরও একটি বড় দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রধান মওলানা ভাসানী নির্বাচন বর্জন করলেন। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হলো। শুরু হলো পশ্চিমাদের মূল খেলা। নির্বাচনের পর সংসদ অধিবেশন ডাকা হলো। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় অধিবেশনের যোগদানে প্রচণ্ড আপত্তি তুলে বললেন, ‘পূর্বপাকিস্তানে অধিবেশন হলে সংসদ ভবন কসাইখানা হবে।’ এ ধরনের ফালতু বক্তব্য দিয়ে তিনি পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তুললেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অধিবেশন স্থগিত করেন। সব দায় তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেদের নির্ভার ভাবতে থাকনে। এদিকে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ জাতির উদ্দেশে অগ্নিঝরা ভাষণ দেন রেসকোর্স ময়দানে। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাঙালিদের উদ্দেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি বলেন, তা হলো, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকের ওপর হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা সব বন্ধ করে দেবে। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’
তার এ বক্তব্যের পর বাঙালির স্লোগান বদলে গেল, নতুন স্লোগান শুরু হলো, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ তার এই অগ্নিঝরা বক্তব্যের পর বাঙালির নতুন চেতনা রক্তে দোল দিতে থাকে। গ্রামে-গঞ্জে মুক্তিপাগল জনগণ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপিত হয়।
এমন জাগরণ বাঙালির জীবনে একবারই জাগ্রত হয়েছিল। সেটা ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের জাগরণ। অর্থাৎ ১৯৭১ সালে অগ্নিঝরা মার্চে।
আলোচনার নামে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কালক্ষেপণ করতে থাকে। গোপনে সে অস্ত্র এনে ঢাকা সেনানিবাসে জড়ো করতে থাকে। যাতে সেই অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা চালাতে পারে। অপারেশন সার্চ লাইটের নামে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা বিডিআর ক্যাম্প এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল আক্রমণ করে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। ২৫ মার্চ শেষ রাতে তারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। তার আগে বঙ্গবন্ধুকে তার দলের নেতা-কর্মীরা তাকে আত্মগোপনে যেতে অনুরোধ করতে থাকে। তিনি তখন জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি কেন আত্মগোপনে যাব, আমি কি বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা? আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদীয় দলের নেতা। আমি আত্মগোপন করলে পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা সারা পৃথিবীতে প্রচার করবে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকারী। সারা পৃথিবীর মানুষ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে ভুল ভাববে। পাকিস্তানিরা এই মোক্ষম অস্ত্র প্রচার করবে এবং সফল হবে। আমি তাদের সে সুযোগ দেব না। তাছাড়া পাকিস্তানি সেনারা আমাকে না পেলে তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে। তারা আরও মেছাকার করবে। আমার নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালিকে নির্বিচারে হত্যা করবে।’
বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তারের আগে বিডিআরের চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার সেই ঘোষণা চট্টগ্রাম শহরে মাইকিং করে তা সবাইকে জানাতে থাকেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান। তারপর কালুঘাট স্বাধীনবাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে এম এ হান্নান প্রথম বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করে বাঙালি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন। তারপর ২৭ মার্চ বেতার কর্মীদের অনুরোধে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। মেজর জিয়ার সেই ঘোষণা পাঠে দারুণ প্রতিক্রিয়া হয়। মানুষের মনে ব্যাপক সাহসের সঞ্চার হয়। তারা বুঝতে পারে প্রতিরোধ যুদ্ধে আমাদের সঙ্গে প্রশিক্ষিত দুর্ধর্ষ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনারাও রয়েছে।
তারপর বঙ্গবন্ধুর ছক করে দেওয়া পথে তার কর্মীরা স্বাধীনতা যুদ্ধ এগিয়ে নিতে থাকে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ ১০ এপ্রিল প্রবাসী সরকার গঠন করেন। ১৭ এপ্রিল প্রবাসী সরকার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করেন। সরকারের ছিলেন বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, খন্দকার মোশতাক আহমেদ পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী, ক্যাপটেন এম মনসুর আলী অর্থ শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী। কর্নেল এম এ জি ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি মনোনীত হন। শপথের পরপরই জাতির উদ্দেশে ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে উদাত্ত আহ্বান জানালে দলে দলে তরুণ যুবারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে থাকে। সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি অঞ্চলে বিভক্ত করে ১১টি সেক্টরে ১১ জন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়।
৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন এক দেশের রক্তাক্ত চিহ্ন অঙ্কিত হয়। এসব সম্ভব হয়েছিল বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কল্যাণে। তিনি ১ কোটি উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। সারা দুনিয়া ঘুরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গণহত্যার নারকীয় চিত্রের কথা প্রচার করতে থাকেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ব্যাপক জনমত গঠনে বিশাল ভূমিকা পালন করেন। ভারতের মাটিতে অস্থায়ী সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করেছেন। তার এই সহযোগিতার কথা বাঙালির কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের রক্তে মিশে আছে ভারত বিরোধিতা আর নাকে লেগে আছে ষড়যন্ত্রের তীব্র গন্ধ। আরও বেদনার ব্যাপার হলো যে মানুষটি দেশের জন্য জীবন-যৌবন জেলে কাটালেন সেই মানুষটিকে সুযোগ পেলেই অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। তাকে নিষিদ্ধ করার বালখিল্য আচরণ ক্রমাগত করে যাচ্ছে অবিমৃশ্যকারী এবং অকৃতজ্ঞ বাঙালি। ১৯৭৫ সালে তাকে হত্যা করার পর ২১ বছর রেডিও টিভিতে তার নাম উচ্চারণ করা যায়নি। আবার সেই পুরোনো খেলা শুরু হয়েছে। তার নাম উচ্চারণ করা মাত্র আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু প্রেমিককে ধরে কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
হে দুর্ভাগা জাতি, তোমরা তোমাদের স্বাধীনতার স্থপতিকে সম্মান না করায় তোমরা ইতিহাসে অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যাকে তোমরা অবমূল্যায়ন করছ তার কোনো ক্ষতি হবে না। তিনি নক্ষত্র হয়ে আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলছেন। অনন্তকাল তিনি এভাবেই জ্বলতে থাকবেন। শুধু তোমরা নিক্ষেপিত হবে অকৃতজ্ঞার অন্ধকারে, নর্দমা এবং অশিক্ষার আস্তাকুঁড়ে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, গল্পকার ও মুক্তিযোদ্ধা