দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মিত্র দলগুলোর বেশির ভাগ প্রার্থীই জয় পাননি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে অংশ নেওয়া জাতীয় পার্টি তাদের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে কম আসন পেয়েছে। দুই দশক ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকা জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিও গত তিনবারের চেয়ে সবচেয়ে কম আসনে জয় পেয়েছে। আশা ভঙ্গ হয়েছে কিংস পার্টি খ্যাতি পাওয়া কয়েকটি ছোট দলেরও।
এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ২৬টি আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। আসনগুলো থেকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল ভোটের ফলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়া আসনগুলোর মধ্যে মাত্র ১১টিতে জয় পেয়েছে জাতীয় পার্টি। বাকি ১৫ আসনেই জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদের ও ভাগ্নে আহসান আদেলুর রহমান পরাজিত হয়েছেন। ঢাকা-১৮ আসনে জি এম কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই আসতে পারেননি। তিনি চতুর্থ স্থান পেয়েছেন।
জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা লাঙ্গলের পক্ষে কাজ না করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষ নেওয়ায় এমন ফল বিপর্যয় হয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় পার্টির একাধিক নেতা। সমঝোতা হওয়া ২৬টি আসনের বাইরে আরও প্রায় আড়াই শ আসনে এককভাবে নির্বাচন করে জাতীয় পার্টি। এই আসনগুলোর একটিতেও জয় পায়নি তারা।
১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর সে বছরের জাতীয় নির্বাচনে ১৫৩টি আসন পায়। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ২৫১টি, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৩৫টি, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৩২টি, ২০০১ সালের নির্বাচনে ১৪টি আসন পায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি। সে নির্বাচনে তারা ২৭টি আসনে জয় পায়। পরের দুই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে অংশ নিয়ে ২০১৪ সালে ৩৪টি ও ২০১৮ সালে ২২টি আসনে জয় পায় জাতীয় পার্টি।
এবার দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধেই নির্বাচনে অংশ নেন। গতকাল ভোট শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের।
গতকাল রংপুর-৩ আসনে ভোট পর্যবেক্ষণের সময় সাংবাদিকদের দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় জি এম কাদের বলেন, ‘জামালপুর, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জায়গায় আমাদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হচ্ছে বলে খবর পেয়েছি। যে পুরোনো কায়দায় আওয়ামী লীগ ভোটকেন্দ্র দখল করে ভোট ডাকাতির নির্বাচন করে, এবারও সেটাই করা হচ্ছে। যদিও বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে এমন কোনো ঘটনা ঘটবে না।’
দুই দশক আগে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময়ে ১৪ দল গঠন করা হয়। এরপর থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছে জোটের শরিকরা। এবারের নির্বাচনে জোটের শরিকদের মধ্যে ৩টি দলকে ৬টি আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। জাসদকে ৩টি, ওয়ার্কার্স পার্টিকে ২টি ও জাতীয় পার্টি জেপিকে ১টি আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। তবে আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেননি। ফলে জাসদ একটি ও ওয়ার্কার্স পার্টি একটি আসনে জয় পেয়েছে। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, জাতীয় পার্টি জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। তারা তিনজনই বর্তমানে সংসদ সদস্য। মঞ্জু ও ইনু সাবেক মন্ত্রীও। এই নেতাদের পরাজয়ে হতাশ তাদের দলের নেতা-কর্মীরা।
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক জোট করা কয়েকটি ছোট দলেরও ভরাডুবি হয়েছে। বিএনপির সাবেক নেতাদের নিয়ে গঠিত তৃণমূল বিএনপি দলের কোনো নেতাই ভোটে জয় পাননি। দলের চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী ও মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও জয় পাননি। বিকল্পধারা বাংলাদেশের একজন প্রার্থীও জয় পাননি। বর্তমান সংসদে তাদের দুজন সংসদ সদস্য রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, এবারের নির্বাচনে ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ বেশির ভাগ আসনে জয় পেয়েছে। জাতীয় পার্টি ১১টি, জাসদ ১টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ১টি, কল্যাণ পার্টি ১টি আসনে জয় পেয়েছে। অন্য দলগুলোর একজন প্রার্থীও জয় পাননি।
প্রভাবশালী কয়েক নেতা ধরাশায়ী
এবারের নির্বাচনে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা পরাজিত হয়েছেন। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়া-২, জাতীয় পার্টি জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পিরোজপুর-২, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ ফরিদপুর-৪, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা রাজশাহী-২, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী হবিগঞ্জ-৪, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী টাঙ্গাইল-৮, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ মাদারীপুর-৩, আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস মুন্সীগঞ্জ-৩, আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল নেত্রকোনা-৩, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারসহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবারের নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি।