শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পরই গা ঢাকা দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। গত ৫ আগস্ট থেকে পলাতক রয়েছেন প্রভাবশালী এই আওয়ামী লীগ নেতা। তবে তার রয়েছে বাড়ি, গাড়ি ও রিসোর্টসহ শত শত কোটি টাকার সম্পদ। এ ছাড়া ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। সাধারণ কর্মচারী থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বিরুদ্ধে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন অনিয়মের অভিযোগ। এ ছাড়া ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা এবং পৃষ্ঠপোষকতার গুরুতর অভিযোগ ছিল। তবে এসব অভিযোগ অনেকটা ওপেন সিক্রেট হলেও ক্ষমতা আর অবৈধ টাকার প্রভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন তিনি।
সাবেক সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বেশ কিছু আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে সম্প্রতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেই তালিকায় রয়েছেন খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সদ্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার নাম। দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা ছিল তার ওপর। তবে শোনা যাচ্ছে, সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে রাঙামাটির সাজেক হয়ে ভারতের মিজোরামে অনুপ্রবেশ করেছেন তিনি। যদিও বিষয়টি সুনিশ্চিতভাবে জানাতে পারেননি দায়িত্বশীল কেউই।
অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগে গত ৪ সেপ্টেম্বর কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদক কার্যালয়ে তলব করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি তার পক্ষ থেকে। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর হত্যাসহ বিভিন্ন সহিংসতা এবং হামলার অভিযোগে এ পর্যন্ত খাগড়াছড়ি সদরসহ জেলার বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা হয়েছে। পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তবে তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তিনি মূলত খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার বাসিন্দা। চাকরির সুবাদে খাগড়াছড়ি এসে ঘাঁটি গাড়েন। চাকরিজীবনে ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অধীন এনজিওর একটি গ্রাম প্রকল্পের কর্মচারী। পরে যোগ দেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি থাকা অবস্থায় ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চান তিনি। তবে সেবারে প্রত্যাখ্যাত হন। ওই নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা। তবে সংসদ সদস্য হতে না পারলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার দেড় বছরের মাথায় ২০১০ সালের ২১ এপ্রিল খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন কুজেন্দ্র লাল। আর চেয়ারম্যান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেলা পরিষদকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেন। তার সময়েই সূচনা হয় নিয়োগ বাণিজ্যের। একাধারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও মৎস্য বিভাগসহ পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত সব বিভাগেই মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ দিতে শুরু করেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন দপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে প্রায় সব খাতকে তিনি গড়ে তোলেন অনিয়ম আর নৈরাজ্যের প্রতীক হিসেবে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ আর অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে মাত্র সাড়ে তিন বছরেই শতকোটি টাকার মালিক বনে যান। আর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থাকার সময় অবৈধ টাকার প্রভাবে ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তৎকালীন এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ১৯ ভোটে হারিয়ে দখলে নেন সভাপতির পদ।
২০১৩ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়ে হয়ে যান সংসদ সদস্য। এরপর আর কেউই ঠেকাতে পারেননি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে। ২০১৭ সালে ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ সম্পর্কিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা সম্পন্ন) পদটিও চলে আসে তার মুঠোয়। সমানতালে চলতে থাকে তার অপরাধ, অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্য। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন পান তিনি। দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আরও বেড়ে যায় তার অপরাধ-অনিয়মের দৌরাত্ম্য। নিজের ঘনিষ্ঠ স্বজনদের বড় বড় পদে বসিয়ে পুরো জেলার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন নিজের হাতে। তার অপকর্মের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন আপন ভাতিজির জামাতা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু, আরেক ভাতিজির জামাতা রামগড় উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদীপ কুমার কারবারী এবং ভাগ্নে হিসেবে পরিচিত খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য খোকনেশ্বর ত্রিপুরা। এদের মাধ্যমে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলে কুজেন্দ্র লাল ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন মূর্তমান আতঙ্ক। অবৈধ টাকার বলে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি টানা তিনবারের মতো দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য হন। এরপরই দায়িত্ব পান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে।
গত এক যুগে কুজেন্দ্র লাল ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি জমি দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য এবং দলের পদ ও কমিটি বাণিজ্য করে সম্পদের পরিমাণ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে গেছেন। খাগড়াছড়ি শহরের খাগড়াপুর, খবংপুরিয়া এবং দীঘিনালায় রয়েছে তার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিনটি বিলাসবহুল বাড়ি। সরকারি জমি দখল করে আলুটিলা পর্যটন এলাকায় খাস্রাং রিসোর্ট, রাঙামাটির সাজেক ভ্যালির কংলাকপাড়ায় ৪ দশমিক শূন্য ৮ একর ভূমির ওপর খাস্রাং নামে রিসোর্টে বিনিয়োগ করেন প্রায় ১০ কোটি টাকা। নামে-বেনামে খাগড়াছড়ি, দীঘিনালা, রামগড় ও পার্শ্ববর্তী রাঙামাটি জেলায় রয়েছে তার শত শত একর জমি। ঢাকার উত্তরায় তার তিনটি দামি ফ্ল্যাট ও পূর্বাচলে রয়েছে কোটি কোটি টাকার জমি। খাগড়াছড়িতে নিজে এবং জামাতাদের দিয়ে অবৈধ ইটভাটার ব্যবসাও পরিচালনা করতেন। বেসরকারি হাসপাতালেও মোটা অঙ্কের অংশীদারত্ব রয়েছে তার। সরকারি প্রকল্প হাতিয়ে কৃষি খামার ও মৎস্য খামার গড়ে তুলেছিলেন। অবৈধ কাঠ ব্যবসা এবং অবৈধ বালু ব্যবসাসহ নানা খাতে শক্তিশালী সিন্ডিকেটও গড়ে তুলেছিলেন কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। বেশ কিছু ট্রাক ও পিকআপ ছাড়াও তার ছিল ল্যান্ডক্রুজারসহ তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি। এ ছাড়া ত্রিপুরায় তার বাড়ি রয়েছে এবং গত এক দশকে শত শত কোটি টাকা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন বলেও জানিয়েছে তারই বিশ্বস্ত একটি সূত্র। বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর, মোটা দাগের সঞ্চয় এবং নিজের পাশাপাশি স্ত্রীর নামেও রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ এবং স্বর্ণালংকার। চাচা শ্বশুরের ক্ষমতার বদৌলতে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন দুই ভাতিজি জামাতা খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু ও রামগড় উপজেলা পরিষদের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদীপ কুমার কারবারীসহ বহু অনুসারী। তবে পাহাড়সম সম্পদের মালিক বনে যাওয়া কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা নির্বাচনি হলফনামায় সম্পদের সিকি ভাগও উল্লেখ করেননি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনের হলফনামা ঘেঁটে দেখা গেছে গত ১০ বছরে তার আয় বেড়েছে ১৩ গুণ। তবে প্রকৃত হিসাব আরও অন্তত ২০ গুণ বেশি। সম্পদের পরিমাণও ৮৫ শতাংশের বেশি আড়াল করেছিলেন হলফনামায়।
কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ক্ষমতার চেয়ারে থাকার সময়েও খবরের কাগজে কয়েক দফায় তার অনিয়ম, দুর্নীতি ও নারী আসক্তির সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এর আগেও একাধিকবার দুদক তার দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমেছিল। তবে ক্ষমতা আর অবৈধ টাকার প্রভাব খাটিয়ে কেন্দ্রীয় বড় নেতাদের মধ্যস্থতায় তা সামলেও নিয়েছিলেন। অসংখ্য অনিয়ম আর সীমা লঙ্ঘিত দুর্নীতি করা সত্ত্বেও কখনো জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি তাকে। শুধু তাই নয়, বিরোধী মত দমনেও তার ভূমিকা ছিল কঠোর। বিএনপি নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি নিজ দলের ভিন্নমতের নেতা-কর্মীদেরও উৎখাত করতে মরিয়া ছিলেন তিনি। গত এক যুগে আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী তার হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। এ নিয়ে তার আপন বেয়াই জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি রণ বিক্রম ত্রিপুরা ও খাগড়াছড়ি পৌরসভার সাবেক মেয়র বহু বছর ধরেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছেন।
খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছার বলেন, ‘আওয়ামী শাসনের গত সাড়ে ১৫ বছরে খাগড়াছড়ি জেলায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের নামে দুই শতাধিক মামলা হয়েছে। যার বেশির ভাগই কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার নির্দেশে হয়েছিল। এ ছাড়া শতাধিকবার বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করিয়েছেন তিনি। তার নির্দেশে বিএনপি নেতা-কর্মীদের হত্যাও করা হয়েছিল।’
কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার প্রতিবেশী খনিরঞ্জন ত্রিপুরা বলেন, ‘একসময় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (এনএলএফটি) পৃষ্ঠপোষক ছিলেন কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। খাগড়াছড়ি সদরের খাগড়াপুর, দীঘিনালা ও পানছড়িতে অবস্থানরত এনএলএফটির ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। একই সঙ্গে ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সদস্যদের রসদও সরবরাহ করতেন তিনি।’
খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শান্তি প্রিয় চাকমা বলেন, ‘আলুটিলার খাস্রাং রিসোর্টে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা একটি জলসা ঘর বানিয়েছিলেন। সেই জলসা ঘরে নিয়মিত নারীদের নিয়ে আমোদ-ফুর্তি করতেন। তার রক্ষিতা অনেক নারীকে বাড়ি-গাড়িও করে দিয়েছেন। অনেককে আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদ-পদবি দিতেন কিংবা সরকারি চাকরি দিতেন। একই সঙ্গে খাস্রাং রিসোর্টে মদ এবং জুয়ার আসর বসানোর বিষয়টিও জেলার সবার জানা।’
খাগড়াছড়ি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন মজুমদার বলেন, ‘কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ক্ষমতার চেয়ারে বসে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অপরাধ করে গেছেন। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি করেছেন নিয়োগ বাণিজ্য ও সরকারি উন্নয়ন কাজে। এসব বিষয়ে একাধিকবার দুদক তৎপর হলেও অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে এতদিন তা আড়ালে ছিল। আশা করি, এবার সেসব দুর্নীতি এবং অপরাধ সামনে আসবে।’