বুধবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীতে সরকারনির্ধারিত দামে ডিম বিক্রি হয়নি। মাত্র এক দিন আগেই সরকারের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে ফার্ম থেকে সরাসরি আড়তে আসবে ডিম, আর খুচরায় ডজন বিক্রি হবে ১৪২ টাকায়। তবে কোথাও ১৬০ টাকার নিচে ডিম বিক্রি হয়নি।
বিভিন্ন ফার্ম থেকে ২০ লাখ ডিম আজ থেকে সরকারনির্ধারিত দরে পাবেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এসব ডিম তেজগাঁও আড়ত ও কাপ্তান বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে পাইকারি ব্যবসায়ীরা রাজধানীতে ১৩২ টাকায় এক ডজন ডিম খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। ফলে ভোক্তাপর্যায়ে নির্ধারিত দরে অর্থাৎ ১৪২ টাকা ডজন ডিম কিনতে পাবেন। গতকাল বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত জুলাই থেকে দেশজুড়ে ডিমের বাজার লাগামহীন। এ নিয়ে হইচই পড়লে বাধ্য হয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গত ১৫ সেপ্টেম্বর খুচরা পর্যায়ে ১৪২ টাকা ডজনে ডিম বিক্রির নির্দেশ দেয়। পাইকারি পর্যায়ে ডজন বিক্রির নির্দেশ দেয় ১৩২ টাকায়। তবে আড়তদাররা ১৫০ টাকার বেশিতে তা বিক্রি করেন। ফলে ভোক্তাপর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭০-১৮০ টাকায়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভিন্ন বাজারে অভিযানে গিয়ে জরিমানা করলেও স্থিতিশীলতা আসেনি। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নেয়। এরই অংশবিশেষ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গত মঙ্গলবার ডিমের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে ডিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ডিলার, ডিম ব্যবসায়ী সমিতি, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে সিদ্ধান্ত হয় সরকারনির্ধারিত যৌক্তিক মূল্যে অর্থাৎ ১৪২ টাকা ডজন ডিম বিক্রি হবে বুধবার থেকে।
কিন্তু গতকাল সকালে বিভিন্ন বাজারে ১৭৫ টাকা ডজন ডিম বিক্রি হয়েছে। মোহাম্মদপুরের স্বপ্নধারা হাউজিং মার্কেটে ডিম বিক্রেতা রিয়াজ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘দাম কিছুটা কমেছে। ১৭০ টাকা ডজন। টাউন হল বাজারের ডিম বিক্রেতা জামাল ও শরিফ বলেন, আগের চেয়ে দাম কিছুটা কমেছে। এক প্রশ্নের উত্তরে শরিফ বলেন, ‘এই দেখেন ক্যাশ মেমো, নীলিমা এন্টারপ্রাইজ থেকে ১২ টাকা ৩০ পয়সা পিস বা ১৪৮ টাকা ডজন কেনা। তাহলে কীভাবে ১৪২ টাকা ডজন বিক্রি করব। তেজগাঁও আড়তে কম দাম রাখলে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারব।’
তাদের কথার সত্যতা যাচাই করতে তেজগাঁও স্টেশন রোডে আলেক এন্টারপ্রাইজ আড়তে গেলে এর স্বত্বাধিকারী এবং তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট হারুন অর রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেলে সিদ্ধান্ত হয়েছে সরকার নির্ধারণ করা দামে ডিম বিক্রি হবে। কিন্তু করপোরেট ফার্ম থেকে তো ১২৭ টাকা ডজন ডিম দেয়নি। তাহলে আমরা কীভাবে বিক্রি করব। তারা ডিম দেয়নি। তাই আমরাও বুধবার সকালে কম দামে ডিম বিক্রি করতে পারিনি। মঙ্গলবার সরকারের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকে ডায়মন্ড, কাজী ফার্মস, প্যারাগন, সিপিসহ অনেক কোম্পানির কর্মকতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে তারা কথা রাখেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সিন্ডিকেট করি না। যদি তাই হতো তাহলে ঢাকায় আমরা তিন দিন ডিম বিক্রি বন্ধ করলেও কীভাবে পাওয়া যায়। অনেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে সরাসরি ডিম আনে। এ জন্য অন্য বাজারে ডিম পাওয়া যায়। আসলে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি। এ জন্য দাম বাড়তি। ভোক্তা অধিদপ্তরের মিটিংয়ে যেভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, করপোরেট ফার্ম থেকে ডিম দেওয়া হলে সমস্যা হবে না। ডিমের দাম কমে যাবে। এতে আমাদের জন্যও ভালো হবে। মানুষের মন্দ কথা শুনতে হবে না।’
তেজগাঁও স্টেশন রোডে ডিমের আড়তদার মেসার্স নাসির অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ১৪-১৫ লাখ ডিম বিক্রি করি। কাপ্তান বাজারসহ অন্য বাজারেও ডিম বিক্রি হয়। করপোরেটরা মোট চাহিদার ২০ শতাংশ সরবরাহ করে। কিন্তু তারাই দামটা নিয়ন্ত্রণ করে। কাজেই তাদের ডিম পেলে দাম বাড়বে না। সরকারনির্ধারিত দরে আমরা খুচরা বিক্রেতাদের ডিম দিতে পারব।’
আড়তদারদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ডায়মন্ড কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান মেজবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বুধবার থেকে সরকারনির্ধারিত দরে ডিম দেওয়া কথার ছিল। এটা সত্য। কিন্তু আমাদের মধ্যে গোছগাছ করতে একটু সময় লাগছে। এ জন্য সকালে দিতে পারিনি। রাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রি সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এবং ওয়াপসা, বাংলাদেশ পোলট্রিশিল্পের সবকিছু দেখভাল করে। তারা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিদিন রাজধানীতে ২০ লাখ করে ডিম সরবরাহ করা হবে। তেজগাঁওয়ে ১০ লাখ এবং কাপ্তান বাজারে ১০ লাখ ডিম পাইকারদের কাছে দেওয়া হবে। মোট উৎপাদনের ৩৫ শতাংশ ঢাকায় এবং সারা দেশে ৬৫ শতাংশ ডিম দেওয়া হবে, যাতে সবাই যৌক্তিক মূল্যে প্রাণিজ আমিষ খেতে পারেন। বুধবার রাত ৩টা থেকে এসব ডিম দেওয়ার কথা।’
এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আলীম আখতার খান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এখন থেকে ডিমের বাজারে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না। বিভিন্ন করপোরেট ফার্ম থেকে রাত ৩টায় দুই জায়গায় ২০ লাখ ডিম দেওয়া হবে। যার ফলে ভোক্তারা বৃহস্পতিবার (আজ) থেকে কম দামে ডিম কিনতে পারবেন।’