সাত বছর ধরে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ শহরের একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন মোহাম্মদ হালিম (৪৩)। গত মাসে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল ও পূর্বের কয়েকটি এলাকা ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সপ্তাহ ধরে অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি হামলা বাড়তে থাকলে হালিমসহ ওই অঞ্চলে বসবাসকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায়, চারদিকে গোলার আওয়াজ, বিস্ফোরণ আর ধ্বংসযজ্ঞ।
হামলার তীব্রতা কমলে তিনিসহ আরও কয়েকজন বাংলাদেশি অঞ্চলটির অপেক্ষাকৃত নিরাপদ সাইদা এলাকার একটি আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেন। সেখানেও হামলার আশঙ্কা থাকায় কিছুদিন পর চলে যান দেশটির রাজধানী বৈরুতে। সেখান থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় সোমবার (২১ অক্টোবর) মোহাম্মদ হালিম নিরাপদে দেশে ফিরেছেন।
ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে লেবানন থেকে প্রথম দফায় তার মতো ৫৪ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের মধ্যে ৭ জন শিশু ও ৪৭ জন নারী-পুরুষ রয়েছেন। বৈরুতের রফিক হারিরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিশেষ বিমানে করে গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
বিভীষিকাময় দিনগুলোর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত মনে করছিলাম, হয়তো আজকেই শেষ দিন। প্রতিদিনই গোলার আওয়াজ কানে আসত। পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় গলার স্বর কাঁপত। দেশে ফিরতে পারব কি না, এটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিমানবন্দরে পৌঁছানো পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, যেকোনো সময় কিছু ঘটে যেতে পারে।’
রাজধানী বৈরুতে পরিবারসহ বসবাস করতেন মো. হুসাইন (৩৭)। কাজ করতেন শহরটির একটি বিপণিবিতানে। এক সন্তানসহ সস্ত্রীক তিনি দেশে ফিরেছেন।
অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেখানে থাকতাম তার পাশেই কয়েকটি বিল্ডিং ইসরায়েলি বাহিনী ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন শুধু বাঁচার আশায় দিন কাটত। যুদ্ধের ভয়াবহতা কেবল শুনেছি, কখনো নিজের চোখে দেখিনি। যখন প্রথম আকাশে যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনি, মনে হয়েছিল পালানোর কোনো উপায় নেই। পরিবারসহ দেশের মাটিতে ফেরার জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করছিলাম।’
যুদ্ধের শঙ্কায় নিরাপদ অঞ্চল থেকেও বাংলাদেশিরা ফিরেছেন
লেবাননের যেসব এলাকায় এখনো সরাসরি আক্রমণ হয়নি, সেখান থেকেও অনেক বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় তারা বুঝতে পারছিলেন যুদ্ধ যেকোনো সময় তাদের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি এড়াতে এবং পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে বহু শ্রমিক দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
উত্তরাঞ্চলের ত্রিপোলিতে একটি যন্ত্রাংশ নির্মাণ কোম্পানিতে কাজ করতেন মোহাম্মদ আরিফ (৩৮)। তিনি বলেন, ‘যদিও আমাদের এলাকায় এখনো হামলা হয়নি, কিন্তু যুদ্ধ যে কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেটা আমরা জানি। বোমার শব্দ অনেক দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল। দিন দিন মনে হচ্ছিল, আমরা এখানে আর নিরাপদ নই। ফলে পরিবারকে চিন্তায় না ফেলে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।’
নিরাপদ এলাকার বাংলাদেশিদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, তারা শুরুতে ফিরতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কারও কারও কাজের মেয়াদ এখনো বাকি ছিল, আর তাদের অনেকে ভাবছিলেন পরিস্থিতি হয়তো এতটা খারাপ হবে না। কিন্তু যুদ্ধের বিস্তার ও অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা ক্রমে অবনতির দিকে গেলে তারাও দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
এমন এক প্রবাসী জাহানারা আক্তার (৪০) বলেন, ‘প্রথমে ভাবছিলাম হয়তো আমাদের এলাকায় কিছু হবে না। কিন্তু ইসরায়েলি হামলা যেভাবে বেড়ে চলেছে, আমরা বুঝতে পারছিলাম খুব বেশি দিন আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। তাই প্রাণের ঝুঁকি না নিয়ে চলে এসেছি।’
ঋণের বোঝা আর অনিশ্চয়তা
লেবানন থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই বিশাল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরেছেন। যুদ্ধের কারণে আকস্মিকভাবে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বেশির ভাগ প্রবাসী কাজের জন্য বহু টাকা ধার করে বা সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেই ঋণ এখন তাদের জীবনে নতুন এক দুশ্চিন্তার নাম হয়ে উঠেছে।
মোহাম্মদ রনি (৩৮) ৭ লাখ টাকা ধার করে লেবাননে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করেছিলাম, তিন থেকে চার বছরের মধ্যে সব ঋণ শোধ করে কিছু সঞ্চয় করতে পারব। কিন্তু মাত্র দেড় বছর কাজ করার পরই যুদ্ধ শুরু হলো। এখন দেশে ফিরে কোনো কাজ নেই, কিন্তু ঋণ তো আর মাফ হবে না। কীভাবে এই টাকা শোধ করব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা।’
লেবাননে থাকাকালীন অনেক প্রবাসী পরিকল্পনা করেছিলেন, পরিবারকে অর্থ পাঠিয়ে ঋণ শোধ করবেন এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করবেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই সব স্বপ্ন এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। রুমা খাতুন (৩৬) বলেন, ‘আমার মা জমি বিক্রি করেছিলেন, যাতে আমি লেবাননে কাজ করতে পারি। কিন্তু এখন জমি বিক্রির টাকাই মাকে শোধ করতে পারিনি। দেশে এখন কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।’
প্রবাসীদের মধ্যে অনেকেই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তাদের ঋণ শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, এটি সামাজিক ও মানসিক চাপও তৈরি করছে। বিশেষ করে যারা গ্রামের বাড়ি থেকে বিদেশে কাজ করতে গিয়েছিলেন, তাদের জন্য পরিবারের কাছে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা মানে সমাজের দৃষ্টিতে একধরনের লজ্জাও।
ফিরে আসা এমন এক প্রবাসী শরিফ চৌধুরী (৩৩) বলেন, ‘এক বছর আগে বিয়ে করেছি। ভালো আয়ের আশায় আট মাস আগে লেবানন গিয়েছি। আমার পরিবার অনেক আশা নিয়ে আমাকে বিদেশে পাঠিয়েছিল। এখন আমি খালি হাতে ফিরে এলাম, কিন্তু যা ঋণ করেছিলাম সেটাও পরিশোধ করতে পারব না। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে নতুন করে শুরু করব, সেটা বুঝতে পারছি না।’
লেবাননফেরত প্রবাসীদের অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।
তিনি বলেন, ‘যত টাকা লাগুক না কেন, লেবাননে আটকে থাকা প্রবাসীদের নিরাপদে দেশে ফেরত আনা হবে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’
ফেরত আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তাদের পুনর্বাসনে সরকার কাজ করবে। ফেরত আসা প্রবাসীদের ক্ষতি মূল্যায়ন করে সরকার তাদের সর্বোচ্চ সাহায্য করার চেষ্টা করবে।’