গত জুলাই ও আগস্টে আন্দোলনে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের কারণে দেশে এবং বিদেশে সমালোচনার শিকার হয় পুলিশ। তবে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে আতঙ্কে পুলিশ পালিয়ে যাওয়ায় থানাগুলো কয়েক দিন ফাঁকা পড়ে থাকে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ অবনতি ঘটে। ফলে আন্দোলন পরবর্তীকালে সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে পুলিশকে।
এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। সরকার পুলিশকে গণবান্ধব করার জন্য একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, পুলিশ আপাতত ৩টি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এক. পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে যোগ্যদের মনোনীত ও পদায়ন করা। দুই. আন্দোলনে ভিকটিমদের মামলাগুলো যথাযথ তদন্ত করা এবং দ্রুতই চার্জশিট দেওয়া। তিন. থানাকেন্দ্রিক সেবার মান বাড়ানো। পুলিশকে ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রেও এই তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে অতি উৎসাহী কিছু পুলিশের জন্য গোটা বাহিনীর ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তির দায় গোটা বাহিনীর নেওয়া উচিত নয় বলে মনে করে পুলিশ। ফলে মহাজোট সরকারের আমলে যেসব পুলিশ কর্মকর্তার জন্য পুলিশের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে তাদের বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের অনেককেই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। কেউ কেউ বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন। আবার অনেকে পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ঘোষণা করেছেন যে, ‘যেসব পুলিশ কর্মকর্তা পলাতক অবস্থায় রয়েছেন তারা সন্ত্রাসী। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম খবরের কাগজকে জানান, ‘জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য তারা কাজ করছেন।’
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনার সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর পুলিশে পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বিশেষ কয়েকটি জেলার বাসিন্দা ও ছাত্রজীবনের ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে তাদের পদোন্নতি দেওয়া হতো। শুধু পদোন্নতি নয়, বদলির ক্ষেত্রেও এই দুইটি বিষয় বিবেচনা করা হতো।
এতে অনেক যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে গেছে। অনেকে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে বদলি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের এ বিষয়ে ক্ষোভ ছিল। কিন্তু চাকরি রক্ষার স্বার্থে তারা কিছু বলেননি। যোগ্য ও কর্মদক্ষ হওয়া সত্ত্বেও মাসের পর মাস ও বছরের পর বছর তাদের পুলিশের গুরুত্বহীন ইউনিটে কাজ করতে হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পুলিশের সব বিভাগে।
সূত্র জানায়, গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর পদোন্নতি ও বদলিতে যোগ্য কর্মকর্তাদের মনোনয়ন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিগত প্রায় ১৬ বছরে যারা যোগ্য হওয়ার পরও পদোন্নতি পাননি তাদের এখন পদায়ন করা হচ্ছে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপিতে ৩০টির বেশি পদে বদলি ও পদোন্নতির আদেশ হয়।
সূত্র জানায়, পদোন্নতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন বিসিএস ১৫ ও ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা। এই দুটি ব্যাচের অনেকেই অতিরিক্ত আইজিপি হয়ে গেলেও কেউ কেউ এসপির দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি তাদের কাউকে-কাউকে আওয়ামী সরকারবিরোধী বলে অ্যাখায়িত করেছিল। গত ২৬ সেপ্টেম্বর দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত থাকা ৪৭ জন এসপিকে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, থানা এবং আদালতে যেসব ভিকটিম মামলা করছেন সেই সব মামলা যথাযথ তদন্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে পুলিশ। মামলার আগে পুলিশ যাতে প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি অবগত হন সেই বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের হয়রানি কমবে এবং মামলার তদন্ত যথাযথ হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়াও থানাকেন্দ্রিক যেসব জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হয়েছে বা হচ্ছে সেগুলো তদন্ত করে ভিকটিমের আস্থা অর্জনের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।
সূত্র জানায়, ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশ থানাকেন্দ্রিক সেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে থানায় আসা মানুষ যাতে যথাযথ সেবা এবং পুলিশি দিক-নির্দেশনা পান তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে রাজধানীর পল্টন থানায় গিয়ে দেখা যায়, ডিউটি অফিসারের রুমে ৪ জন বসে আছেন। ৪ জন চার ধরনের অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। সুমন নামে একজন জানালেন, পুরানা পল্টনে তিনি একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সেই কোম্পানির আইডি কার্ড হারিয়ে গেছে। এ জন্য তিনি জিডি করতে এসেছেন।
এ বিষয়ে ডিউটি অফিসার দীপঙ্কর খবরের কাগজকে জানান, আমরা মানুষকে যথাযথ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। মানুষের অভিযোগ শুনে জিডি নেওয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে জানান, জুলাই ও আগস্টে পুলিশ আন্দোলন দমনে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে। পুলিশের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ফেরাতে হলে পুলিশকে জনমুখী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হতে হবে।