রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ট্রাক ডিপো, মতিঝিল-কল্যাণপুর-মিরপুর-জোয়ার সাহারা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ চারটি জেলায় বাস ডিপো ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তারা ৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিন অর্থবছরে। চালক, কন্ডাক্টর, সার্ভিস অপারেটর ও ব্যক্তি লিজ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ব্যাংক হিসাবে জমা না করায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ তিন অর্থবছরে বড় অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে। প্রাপ্য বকেয়ার কিছু অর্থ আদায় করতে পারলেও নানা মামলা-মোকাদ্দমায় বিআরটিসিকে এখনো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ এই তিন অর্থবছরে ২৪ কোটি ৬২ লাখ ২০ হাজার ৫০৯ টাকার আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে।
বিআরটিসির সাবেক চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া ও মো. এহসান এলাহীর সময়কালে এসব দুর্নীতির দায় এখনো টানতে হচ্ছে বিআরটিসিকে। সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নানা অনিয়ম, দুর্নীতি করে বিআরটিসিতে বিপুল পরিমাণ বকেয়া রেখে গেছেন সাবেক কর্মকর্তারা। আমার দায়িত্বকালে (২০২১ সালের পর থেকে) এই বকেয়ার পরিমাণ এখন ৯ কোটিতে নামিয়ে আনতে পেরেছি। চাপ দিয়ে, বিভাগীয় মামলা দায়ের করে পুরোনো বছরগুলোর বকেয়া আদায় করছি। কিন্তু বকেয়ার পুরো টাকা আদায় করা খুব কঠিন।’
ডিপো ব্যবস্থাপকরা আত্মসাৎ করেছেন প্রায় ৫ কোটি টাকা
তিন অর্থবছরে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মতিঝিল, ঢাকা ট্রাক ডিপো, কল্যাণপুর, মিরপুর, জোয়ার সাহারা, গাজীপুর, বরিশাল, খুলনা এবং রংপুর বাস ডিপোর ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তারা ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৯৩ হাজার ৭৪৫ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অডিট নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে। এসব ডিপোর ব্যবস্থাপকরা সার্ভিস চার্জ থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা দেননি। এর মধ্যে ট্রাক সার্ভিস থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ১৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৫ টাকা। আর বিভিন্ন চালক, কন্ডাক্টর, সার্ভিস অপারেটর ও ব্যক্তি লিজ থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণ ৪ কোটি ৭৩ লাখ ২০ হাজার ১৩০ টাকা। বিআরটিসির বিভাগীয় কর্মকর্তারাও এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেননি বলে নিরীক্ষায় ধরা পড়ে।
ব্যবসার ধরন পরিবর্তন, বিআরটিসি রাজস্ব হারিয়েছে ১২ কোটি টাকা
বিআরটিসির কল্যাণপুর বাস ডিপোর জায়গায় ৩৭টি দোকান বরাদ্দে নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে অডিট প্রতিবেদনে। দোকান বরাদ্দের চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাস ডিপোর অধীনে বরাদ্দ পাওয়া দোকানগুলো শুধু কনফেকশনারি ব্যবসাসংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা যাবে। ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করতে হলে তা বিআরটিসি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। পাশাপাশি দোকান ভাড়ার চার মাসের সমপরিমাণ অর্থ ব্যবসার ধরন পরিবর্তন ফি দিতে হবে। তবে চুক্তির সব শর্ত লঙ্ঘন করে কল্যাণপুরের দোকানগুলো কনফেকশনারির স্টোরের পরিবর্তে বাস কাউন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্যবসার ধরন পরিবর্তনের ফি জমা না হওয়ায় বিআরটিসি ১২ কোটি ২৪ লাখ টাকার রাজস্ব হারিয়েছে ওই তিন অর্থবছরে।
দোকান ও স্থাপনা থেকে ভাড়া আদায় হয়নি ৬ কোটি টাকা
উল্লিখিত তিন অর্থবছরে চট্টগ্রাম, মতিঝিল, কল্যাণপুর বাস ডিপো এলাকায় বিভিন্ন দোকান ও স্থাপনা থেকে বিআরটিসি ভাড়া আদায় করতে পারেনি যথাসময়ে। এতে ৬ কোটি ৫৬ লাখ ২৯ হাজার ৮৮ টাকা রাজস্ব হারায় বিআরটিসি। এই ব্যর্থতার দায়ভার আছে বিআরটিসি প্রধান কার্যালয়েরও। নিরীক্ষায় বলা হয়, সবচেয়ে বেশি ৫ কোটি ৯৪ লাখ ২ হাজার ৭৯৪ টাকা আদায় করতে পারেনি প্রধান কার্যালয়। এসব অনাদায়ী রাজস্ব আদায়ে বিআরটিসি বেশ কয়েকটি মামলাও দায়ের করেছে। বিআরটিসি প্রধান কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ফুলবাড়িয়া সিবিএস-২ মার্কেটের দোকান ও স্থাপনা বকেয়া ভাড়া আদায়ে নানা জটিলতা রয়েছে এখনো। অভিযোগের তির যাচ্ছে প্রধান কার্যালয়ের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিকে।
এ বিষয়ে মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মার্কেটের বিষয়ে মহাজটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তারা এস্টেট ডিপার্টমেন্টটা শেষ করে ফেলছেন। এটাকে এখন সিস্টেমে নিয়ে আসতে হচ্ছে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সংসদ সদস্য যিনি আবার সাবেক মেজর জেনারেল, তিনি বিআরটিসির জোয়ার সাহারা ডিপোর জায়গা নিয়ে দেনাদরবার করতে আসেন। কিন্তু আমি নড়িনি। এস্টেট ডিপার্টমেন্টের এসব বিষয় নিয়ে অনেক মামলা চলছে। অনেক মামলার রায় আমাদের পক্ষে এসেছে।’
ইজারার অর্থ আদায় হয়নি, বিআরটিসি হারিয়েছে ৬ কোটি টাকার রাজস্ব
তিন অর্থবছরে মতিঝিল, কল্যাণপুর, জোয়ার সাহারা, বরিশাল, খুলনা, বগুড়া বাস ডিপো এবং প্রধান কার্যালয় বিআরটিসির বাস রুট বিভিন্ন রুটে ইজারা দেয়। এতে বিআরটিসির ৬ কোটি ২৯ লাখ ৪২ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের কথা থাকলেও তা আদায় করা যায়নি।
তিন অর্থবছরে ইজারার অর্থ বকেয়া থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর জোয়ার সাহারা বাস ডিপো থেকে কেটিআর এন্টারপ্রাইজকে ৯টি বাস বরাদ্দ দেওয়া হয়। অডিট নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, দৈনিক ১ হাজার ২০০ টাকা চুক্তিতে তৌহিদুর রহমান খানের মালিকানাধীন কেটিআর তিন বছর মেয়াদে ৯টি বাস ইজারা দেয় জোয়ার সাহারা ডিপো। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিআরটিসি কেটিআর থেকে ৩৪ লাখ ১২ হাজার ৮০০ টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারেনি। সব মিলিয়ে তিন অর্থবছরে ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার ৩৪০ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয় কেটিআর।
সার্ভিস চার্জ বাবদ বকেয়া ৪ কোটি টাকা
তিন অর্থবছরে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ বাবদ ৪ কোটি ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৫ টাকার রাজস্ব আদায় করতে পারেনি। এর মধ্যে খাদ্য অধিদপ্তর, বিসিআইসি এবং বিজি প্রেসের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে। এ তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পরিবহন সার্ভিস বাবদ কত টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে সে হিসাবও পাওয়া যায়নি অডিট নিরীক্ষায়।
ট্রিপের টাকা জমা হয়নি ব্যাংকে, আর্থিক ক্ষতি ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা
বিআরটিসির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর কর্মকর্তারা তিন অর্থবছরে ট্রিপ থেকে আদায় করা অর্থ ব্যাংকে জমা দেননি। এতে বিআরটিসির ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫৫ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ২০১৯ সালের পাঁচ মাস ও ২০২০ সালের দুই মাসে বিভিন্ন ট্রিপের টাকা আদায়ের রসিদের বিল পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ট্রিপে বিআরটিসি ৩ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার ৩৬৫ টাকা আদায় করেছে। অথচ ওই ডিপোর কর্মকর্তারা ক্যাশ বইতে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৬ হাজার ৭০০ টাকা লিপিবদ্ধ করেছেন। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩৩ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার গরমিল ধরা পড়েছে। অডিট নিরীক্ষায় ধরা পড়ে গরমিলের এই অর্থ সংস্থার ব্যাংক হিসাবেও জমা করা হয়নি।
রয়্যালটি বাবদ বিআরটিসি হারিয়েছে ২৪ লাখ টাকা
ঢাকা থেকে আগরতলা, কলকাতা, শিলং, গুয়াহাটি বা খুলনা থেকে কলকাতা রুটে বিআরটিসির ব্যানারে যাত্রী পরিবহন করছে রয়েল কোচ, এনআর ট্রাভেলস ও শ্যামলী পরিবহন। এই তিন বাস কোম্পানি তিন অর্থবছরে রয়্যালটি ফি বাবদ বিআরটিসিকে ২৪ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করেনি। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে তিন পরিবহনের যাত্রীসেবা বন্ধ হয়ে গেলেও তারা সেই অর্থ পরিশোধ করেনি বিআরটিসিকে।
বিআরটিসি চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এখন বিআরটিসির ১৯টি বাস লিজ দেওয়া আছে। আস্তে আস্তে লিজ দেওয়া বন্ধ করে দেব। লিজের মেয়াদ শেষ হলে আর নবায়ন করতে দেব না। ২০২১ সালে আমি যখন দায়িত্ব নিই, এসে দেখি সব নিয়মকানুনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিআরটিসির বাস সব স্বত্ব ত্যাগ করে বেসরকারি কোম্পানির মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বছরের পর বছর লিজ নেওয়া মালিকরা বিআরটিসিকে রাজস্ব দেয়নি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যে গাড়িগুলো বিআরটিসির বহরে যুক্ত হয়েছিল, সেগুলো ভাঙারি ঘরে গিয়েছে।’
১৩৯টি অকেজো বাস ফেলে রাখা হয়েছে
চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মতিঝিল, কল্যাণপুর, মিরপুর, জোয়ার সাহারা, গাজীপুর বাস ডিপো, গাজীপুর ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও বগুড়া বাস ডিপোতে ১৩৯টি নিলামযোগ্য অকেজো বাস ফেলে রাখা হয়েছিল। এতে সরকারি সম্পদের অপচয় হয়েছে। অকেজো ঘোষিত গাড়ি প্রধান কার্যালয়ের ক্রয় বিভাগের মাধ্যমে নিলামে বিক্রি করতে হয়। ডিপো কর্তৃপক্ষের নিলামে বিক্রি করার সুযোগ নেই। বাসগুলোর যন্ত্রাংশ মেরামতযোগ্য হলেও বাইরের অংশ নষ্ট হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বাস লিজ দেওয়ার সময় শর্ত ছিল, ৬ মাস অন্তর বাসমালিকরা বিআরটিসিতে এসে বাসগুলোর পরীক্ষা করিয়ে নেবেন। কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে তা মেরামত করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাসমালিকরা আসেননি। এতে অনেক গাড়ি হারিয়ে গেছে।’
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গাড়ি লিজ দেওয়ার যৌক্তিকতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জানে, বিআরটিসির গাড়িতে মাইলেজ ধরা আছে। তারা সে মোতাবেক টাকা দেবে। বাইরে থেকে গাড়ি ভাড়া করতে গেলে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপার কঠিন হবে। বিআরটিসির গাড়িতে তেমন সমস্যা নেই। আর সরকারি প্রতিষ্ঠান এখন নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করছে। বিআরটিসিকেও তো তার লাভের দিকটি দেখতে হবে।’