হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। শনিবার (২৪ মে) এ তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এমন সময় হাম প্রাদুর্ভাবের এই চিত্র সামনে এসেছে যখন আর মাত্র তিন দিন পরই ঈদুল আজহা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদযাত্রায় হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক। তাই জ্বর থাকলে ঈদে কোথাও যাওয়া এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
- গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৫১২ জন; আক্রান্তের সংখ্যা ৬২ হাজারের বেশি।
- ঈদযাত্রায় হামের সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই জ্বর থাকলে ভ্রমণ এড়িয়ে চলা ও স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
- শিশু ও বড়- দুই বয়সীরাই হামে আক্রান্ত হচ্ছেন, বিশেষজ্ঞরা বলছেন বড়দের মাধ্যমেও শিশুদের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ প্রথম দিনেই বোঝা যাবে, তা নয়। সাধারণত প্রথমে জ্বর আসে। কারও হাম হলে এর তিন দিন পর বোঝা যায়। তাই কোনো পরিবারের কারও জ্বর থাকলে পুরো পরিবার যেন, ঈদযাত্রা এড়িয়ে চলেন। কারণ কারও মধ্যে হামের সংক্রমণ থাকলে ধরে নিতে হবে পরিবারের সবাই এই জীবাণু বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই ওই পরিবারের যে কারও মাধ্যমেই হামের সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
তারা বলছেন, হামে সংক্রমিত কেবল ছোটরা নয়, বড়রাও হচ্ছেন। একজন বয়স্ক মানুষ হামে সংক্রমিত হলে, তার থেকে অন্যরা সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কারণ ছোটদের তুলনায় বড়রা চলাফেরা করে বেশি। কিন্তু শিশুরা বেশি কাবু হওয়ার কারণে মনে করা হয় যে, বড়রা সংক্রমিত হয় না।
পরিসংখ্যান থেকে বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোভিড-১৯-এর চেয়েও হামের সংক্রমণ বেশি হয়। একজন সংক্রমিত ব্যক্তি বা শিশুর কাছ থেকে ১৬-১৮ জন নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কোভিডের মতো স্বাস্থ্য সচেতনতা মেনে চলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা। বিশেষ করে ঈদযাত্রায় গণপরিবহনে চলাচলের কারণে এই ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজধানীর হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী গতকাল শনিবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ঈদে নাড়ির টানে অনেকেই গ্রামের বাড়িতে যাবেন, কেউ এক শহর থেকে আরেক শহরে যাবেন। কিন্তু এবারের ঈদযাত্রায় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। তাই কারও জ্বর থাকলে অনুরোধ ওই পরিবার যেন এবারের ঈদযাত্রা স্থগিত করে। কারণ হাম না থাকলেও জ্বর থাকলে তিন দিন পর হাম সংক্রমণ শনাক্ত হতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে ওই পরিবারের সদস্যরা তো অন্যদের মধ্যে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমরা কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রেও দেখেছি ঈদযাত্রায় করোনার সংক্রমণ বেড়েছিল।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের শিশুবিশেষজ্ঞ ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার এই সময়ে ঈদযাত্রায় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি খুবই বেশি। টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, এমন শিশুরাও হামে সংক্রমিত হচ্ছে। হামে সংক্রমিত কারও আশপাশে গেলেই সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আছে। গণপরিবহনে তো সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। শিশুরা তো বেশি ভুক্তভোগী। কিন্তু তারা তো গ্রামে গেলে ঘরের বাইরে যাবে, অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলবে, আটকাবে কীভাবে? শিশুরা তো মাস্কও পরে থাকতে চাইবে না। তবুও বলব যতটা সম্ভব যেন সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন।
তিনি বলেন, সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বলছি, কারণ বড়রা জীবাণু বহন করেও বাসায় গিয়ে শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই শুধু শিশু না, বড়দেরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। আর যারা বাড়িতে যাবে, কিন্তু এখনো হামের টিকা নেয়নি, সেসব শিশুর ঈদযাত্রার আগেই টিকা নিয়ে নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক তানভীর আহমেদ বলেন, কোভিডের চেয়েও হাম বেশি ছড়ায়। তাই মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। বড়দেরও হাম হতে পারে। বিশেষ করে বড়দের মাধ্যমে শিশুরা হামে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আছে। কারণ বড়রা যতটা এদিক-ওদিক চলাফেরা করে, শিশুরা কিন্তু তা করে না। তারা বাসার বড়দের কাছ থেকে সংক্রমিত হয়।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫১২ জন। গতকাল শনিবার এই প্রতিবেদন পাঠায় অধিদপ্তর। এদিন সকাল ৮টার আগের ২৪ ঘণ্টার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে এতে।
প্রতিবেদন অনুসারে এই ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে ১৩ জন। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছিল একজনের। এ সময় সারা দেশে আরও ১ হাজার ৯৬৭ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
প্রতিবেদন অনুসারে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৪২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৮৬ জন।
প্রতিবেদন বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬২ হাজার ৫০৭ জনের। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৯ জন। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৪৫ হাজার ১১ জন বাড়ি ফিরেছে।
প্রসঙ্গত হামের রোগী ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও নার্সদের ঈদে ছুটি বাতিল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।
যেসব হাসপাতালে হামে আক্রান্তরা ভর্তি আছে, সে হাসপাতালে ঈদের ছুটির মধ্যে চিকিৎসকরা থাকবেন কি না, নাকি ছুটিতে চলে যাবেন– সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘থাকবেন ইন্শাআল্লাহ। আমরা অলরেডি সার্কুলার দিয়েছি। ধন্যবাদ আপনাকে এটা বলাতে, এটাও আপনারা আশ্বস্ত হতে পারেন, আমরা সতর্ক করছি। হামের রোগী এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবাতে কোনো ডাক্তারের, নার্সের ছুটি হবে না। উপস্থিত থাকতে হবে।’
ঈদের সময় মায়েরা যেন আক্রান্ত শিশুদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে নিয়ে না যান সে অনুরোধ জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাচ্চাগুলোকে যেন অনেক ভিড় আছে এমন জায়গায়ও নিয়ে না যান।