পাথর প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতীক। পাথর নিয়ে আদিকাল থেকে প্রচলিত আছে নানা মিথ, তথ্য, তত্ত্ব। পাথর একধরনের জড় পদার্থ। ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। একখণ্ড পাথরকে ঘিরে সিসিফাসের অসীম অধ্যবসায়ের গল্প তো অনেকেই জানি। এ রকম কল্পকথা সিলেটের পাহাড়, পাথর, জলরাশি আর সবুজ প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে জাফলংয়েও প্রচলিত আছে। এখানকার পাথরের খ্যাতি সুপ্রাচীন। আকারে-প্রকারে, রঙে-ঢঙে, কতশত প্রাকৃতিক পাথর। এই পাথর নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে একটি জাদুঘর। নাম ‘স্টোন মিউজিয়াম জাফলং’। সিলেট জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন এই উদ্যোগটি বাস্তবায়িত করছে। বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে এই প্রথম পাথরের জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। শনিবার (২১ ডিসেম্বর) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হবে এর।
ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য গড়ে তোলা এই অভিনব জাদুঘর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেটের ইকো-ট্যুরিজম কনসালটেন্ট ও বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজিজুর রহমান।
জাদুঘরটির প্রস্তুতি পর্ব পর্যবেক্ষণ করে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, রকস মিউজিয়াম বা পাথরের জাদুঘর বাংলাদেশে কেবল পঞ্চগড়ের একটি কলেজে আছে বলে জেনেছি। একজন কলেজশিক্ষকের পাথর গবেষণা বা সংগ্রহের আগ্রহ থেকে সেটি ১৯৯৭ সালে স্থাপিত হয়। সেদিক থেকে জাফলংয়ের পাথরের জাদুঘরটি বাংলাদেশে প্রথম সরকারি বা প্রশাসনিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।
পাথররাজ্যে পাথরের প্রজাতি ও প্রকৃতি চেনার কী উপায়? পাথরের সংগ্রহশালা নেই কেন? জাফলংয়ে বেড়াতে গিয়ে পর্যটকদের এ রকম প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে পাথরের জাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদের পরিকল্পনায় জাদুঘর গড়ার ভাবনাটি বাস্তবায়িত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় গত অক্টোবরে। দুই মাসের মধ্যে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন এখন এটি প্রতিষ্ঠা করছে। গোয়াইনঘাটের ইউএনও মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, একটানা দুই মাসের চেষ্টায় পাথরের জাদুঘরটি দৃশ্যমান করা হয়েছে। জাফলংয়ে পর্যটন মোটেলসংলগ্ন স্থানে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে জাদুঘরটি স্থাপন করা হলো। প্রাথমিকভাবে এটি পর্যটক আকর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হলেও পরে পাথর নিয়ে আগ্রহী গবেষক ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের পরামর্শে জাদুঘরটি সমৃদ্ধ করার প্রয়াস থাকবে।

পাথরের জাদুঘরের সম্ভাব্যতা, স্থাপন ও অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ৩৫ প্রজাতির পাথরের সংগ্রহ রাখা হচ্ছে। এসব পাথরের উৎস সিলেটের জাফলং, শ্রীপুর, ভোলাগঞ্জ, লোভাছড়া। পাথর সংগ্রহে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের টিম। পাথরগুলো জাদুঘরের গ্যালারিতে রাখা হবে। ইনডোর ও আউটডোর পাথরে সজ্জিত করে কোয়ারি এলাকার দৃশ্যপট সাজানো হবে। পর্যটকরা সেই দৃশ্যপট দেখে পাথরের উৎসভূমি সম্পর্কেও অবহিত হবেন। পাথরের সঙ্গে উৎসভূমি হিসেবে প্রাকৃতিক দৃশ্যপট হিসেবে থাকবে জাফলং-ডাউকি পয়েন্ট, নদী ও ঝুলন্ত সেতু, জল-পাথর-পাহাড়ের বিছনাকান্দি, মায়াবী ঝরনা, পান্থুমাই ইত্যাদি। থাকবে পাথর দিয়ে তৈরি নানা তৈজসপত্র। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীনকাল থেকে সুখ্যাত জাফলংয়ের শিলপাটা ও হামানদিস্তাসহ পাথরে খোদাই করা বিভিন্ন নান্দনিক ডিজাইনের স্যুভেনির।
জাফলংয়ের পাথর সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ার মূলে রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। কিন্তু এই প্রাকৃতিক পরিবেশ এখন বিপন্ন। বিষয়টি গত প্রায় এক দশক ধরে নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। পরিবেশবাদীদের দৃষ্টিতে জাফলং বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রতিবেশে সংকটাপন্ন একটি এলাকা। ২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বর এই স্থানকে ‘পরিবেশ-প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)’ ঘোষণা করে গেজেটও প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইসিএ এই ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে কয়েক ধাপে জাফলং থেকে বালু ও পাথর কোয়ারির ইজারা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। প্রতিবছর এখানকার পাথর সম্পদ মজুতের বিষয়টি পরিমাপ করে উপজেলা প্রশাসন। সর্বশেষ গত ২৬ জুলাইয়ের পরিমাপ অনুযায়ী জাফলংয়ে পাথর মজুতের পরিমাণ ৩ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট। পাশাপাশি রয়েছে ‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের’ খনি। ২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি জাফলংকে ‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ ঘোষণা করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে জাফলংয়ের ২২ দশমিক ৫৯ একর জায়গাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়। উন্মুক্ত শিলাস্তর, চুনাপাথর সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য জাতীয় স্বার্থে ২৫ দশমিক ৫৯ একর ভূমিকে ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ঘোষণা করা হয়।

জাফলংয়ের জাদুঘরকে ঘিরে সেই ঐতিহ্যে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টিও আলোচনায় এখন। দর্শনার্থীদের একনজর দেখা থেকে ঐতিহ্যবোধ জাগ্রত হলে সাধারণের মধ্যে পাথরসম্পদ সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জাফলংয়ের প্রকৃতিকে সুস্থ রাখতে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা আমাদের প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের মিশেলে জাফলংকে সমৃদ্ধ করতে চাই।’
প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধির এই চাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক নিদর্শন হতে চলেছে পাথরের জাদুঘরটি। উদ্বোধন উপলক্ষে জাফলংয়ের সুবিশাল বালুতটে গত বৃহস্পতিবার থেকে তিন দিনের ক্রীড়া-সংস্কৃতি ও পর্যটন মেলার আনুষ্ঠানিকতা চলছে। এ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফুটবলের ঐতিহ্যে প্রকৃতির নতুন বেশ, জাফলংয়ের রং-তুলিতে নতুন বাংলাদেশ’। জাফলং পিয়াইন ফুটবল টুর্নামেন্ট, সিলেট ট্যুরিজম ফটোফেস্ট ও পর্যটন উন্নয়নে বালুতটে নানা আয়োজনের মধ্যে আকর্ষণীয় ছিল ‘ফটোফেস্ট’। এতে জাফলংয়ের প্রকৃতির শতাধিক আলোকচিত্রের প্রদর্শন হয়। ফটোফেস্ট কিউরেটিং করেছে উদ্যোক্তা উত্তম কুমার দাশ। আজ শনিবার বেলা ৩টায় জাদুঘরের উদ্বোধন করবেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী। জাদুঘরের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে তিন দিনের আয়োজন।