মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যসহ অন্যান্য এলাকায় চলমান সংঘাত ও নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢল নেমেছে। গত কয়েক মাসে নতুন করে আরও প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। রোহিঙ্গা ঢল বন্ধ করতে কক্সবাজারে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম ইতোমধ্যে স্থগিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী করা যায়, তা নিয়ে মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠকে বসছেন রোহিঙ্গাবিষয়ক ন্যাশনাল টাস্কফোর্সের সদস্যরা।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকাসহ আঞ্চলিক সেনাসদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। বাংলাদেশ ও মায়ানমারের পুরো সীমান্ত এলাকা এখন তাদের দখলে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত কীভাবে পরিচালিত হবে, সীমান্তে চোরারচালান ও মাদক প্রতিরোধ এবং সীমান্ত বাণিজ্য কীভাবে চালানো হবে তা নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে আরাকান আর্মির সঙ্গে। তবে এই আলোচনা শুধুমাত্র গোয়েন্দা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেছেন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে নেওয়া নন-স্টেট অ্যাক্টরের (আরাকান আর্মি) সঙ্গে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ দর-কষাকষি করতে পারে না।
এদিকে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কক্সবাজারে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম অপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। কারণ, রোহিঙ্গাদের ধারণা জাতিসংঘের রেজিস্ট্রেশনভুক্ত হলে বাংলাদেশে সব ধরনের সাহায্য মিলবে। এই আশায় নতুন করে আরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে। এরপরও গত ২০ দিন আগে অর্থাৎ রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম স্থগিত করার আগ পর্যন্ত ইউএনএইচসিআর নতুন রেজিস্ট্রেশন করেছে ৬২ হাজার রোহিঙ্গার। এতেও অনুপ্রবেশ থামছে না। কারণ, অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তা করছে দালালসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আগামীকাল জরুরি বৈঠকে বসছেন এ সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের সদস্যরা। সূত্র আরও জানায়, এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা প্রবেশ নির্বিঘ্ন করতে সীমানা খুলে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, আমাদের নীতিগত অবস্থান ছিল আর কোনো রোহিঙ্গাকে ঢুকতে দেব না। তবে পরিস্থিতি কখনো কখনো এমন দাঁড়ায়, আমাদের কিছু আর করার থাকে না। রোহিঙ্গাদের আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ঢুকতে দিয়েছি, তাও না। তারা বিভিন্ন পথে ঢুকেছে। আর একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রচুর দুর্নীতি আছে সীমান্তে। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থাৎ দালালদের টাকা দিয়ে তারা ঢুকছে। নৌকা নিয়ে ঢুকছে। শুধু একটা সীমান্ত দিয়ে যে তারা ঢুকছে, বিষয়টি এমনও না। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে তারা ঢুকছে। এটাকে আটকানো খুব কঠিন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাখাইনে আঞ্চলিক সেনা সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা দেশটির জান্তা সরকারের জন্য একটি বড় ধাক্কা। কেননা, এটি ছিল রাখাইনে জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটি।
আরাকান আর্মি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহর মংডুর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সেখানে অনেক রোহিঙ্গার বসবাস। এএ’র কাছে জান্তা সরকার পরাজিত হওয়ার পর চাপে পড়েছে রোহিঙ্গারা। তাদের অনেকের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। জীবন বাঁচাতে মংডু ছেড়ে অনেক রোহিঙ্গা নানা কৌশলে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। অনেকে এপারে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপরিচিতদের বাসায় উঠছে। আবার রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণির, তারা ক্যাম্পে না উঠে টেকনাফ ও উখিয়ায় বাসা ভাড়া করে বসবাস শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নাফ নদে কড়াকড়ি পাহারা থাকায় পাহাড়ি পথে ঢুকছে রোহিঙ্গারা। মংডু শহর এএ’র দখলে চলে যাওয়ার পরও কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার সীমান্তে থেমে নেই গোলার বিকট শব্দ। বন্ধ হচ্ছে না বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা স্রোত। বান্দরবান জেলার পাহাড়ি অঞ্চল দিয়ে এবার রোহিঙ্গার পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজনও ঢুকছে। গত ১৮ নভেম্বর বান্দরবানের ঘুমধুম বাইশফাঁড়ি সীমান্ত দিয়ে তঞ্চংগ্যা ও বড়ুয়া সম্প্রদায়ের অর্ধশতাধিক নাগরিক অনুপ্রবেশ করে উখিয়ায় অবস্থান করছে।
সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, রোহিঙ্গারা নানা কৌশলে অনুপ্রবেশ করছে। এমনকি রাতের আঁধারে সাঁতরে বাংলাদেশে আসছে। আবার মংডুতে রোহিঙ্গাদের কেন্দ্র করে আরাকান আর্মিও বাণিজ্যে নেমেছে। যেসব রোহিঙ্গা তাদের অর্থ দিচ্ছে, তাদের বাংলাদেশ সীমান্তে আসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে তারা।
সীমান্তে বসবাসকারী রফিকুল হুদা বলেন, দালালরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে নৌকায় রোহিঙ্গাদের এপারে নিয়ে আসে। এর পর সুযোগ মতো গন্তব্যে পাঠায়। দালালদের ধরা না হলে অনুপ্রবেশ বন্ধ করা কঠিন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, আরাকান আর্মি মংডুকেন্দ্রিক আক্রমণ জোরদার করার পর থেকেই বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ কিছুটা বেড়েছে। কারণ, মংডু রোহিঙ্গা অধ্যুষিত শহর। সেখানে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মায়ানমারের সংঘাত ঘিরে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকেই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জটিল হয়ে পড়েছে। আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে সহায়তা করবে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ জান্তা সরকারের হয়ে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে রোহিঙ্গারা। এতে সংকট আরও বেড়েছে।
টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা সৈয়দ আলম বলেন, ‘রাখাইনে যুদ্ধের নামে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা হচ্ছে। এখনো মংডু শহরে তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা রয়েছে। সেখানে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানুষ জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একাধিক সংস্থার সদস্যরা বলছেন, বান্দরবান সীমান্তের পাহাড়ি এলাকার নাইক্ষ্যংছড়ি, ঘুমধুম, তুমব্রু, জামছড়ি, লেবুছড়ি, আলীকদম, পশ্চিমকুল সীমান্তে পাহাড়ি অঞ্চলসহ টেকনাফের হোয়াইক্যং ও হ্নীলা এলাকা দিয়ে রোহিঙ্গারা ঢুকছে। এসব সীমান্তে একাধিক দালাল সক্রিয় রয়েছে। তারা ২০-৩০ হাজার টাকা নিয়ে তাদের সুযোগ করে দিচ্ছে। মায়ানমারের দালালের পাশাপাশি এপারেও অনেক দালাল রয়েছে। তাদের মধ্যে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের জলপাইতলী এলাকায় জকির আহমদ সিন্ডিকেট প্রধান ও কামরুল হাসান সোহেল, নুরুল আমিন ওরফে মনিয়া, ইসমাইল, ইব্রাহিম, সরওয়ার, দেলোয়ার, বাইশফাঁড়ির জকির আহমদ জাহাঙ্গীর, আলমগীর, শাহ আলম ওরফে রাঙ্গা শাহ আলম, রাসেল, কামরুল হাসান সোহেল, ছৈয়দ আলম, উসিংলা, মংসিং তঞ্চংগ্যা, মোবারকসহ অনেকে রয়েছে।