মায়ের ভাষা মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় যে দেশ রক্ত ঝরিয়েছে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে, সে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চার অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
সরকারিভাবে স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন ৫০টি; যারা ৪১টি ভাষায় কথা বলেন। চাকমা, মণিপুরি, মারমা, ককবরক, আচিক ও সাদরি ভাষার লিখিত লিপি থাকলেও অধিকাংশ ভাষার লিখিত রূপ নেই। নৃতাত্ত্বিক ভাষা ও ভাষার সংস্কৃতি সুরক্ষার বিষয়ে সরকারিভাবে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও সেই কাজে অগ্রগতি নেই। ভাষাতাত্ত্বিক সমীক্ষার কাজ শেষ হলেও তা বই আকারে প্রকাশের সব উদ্যোগ থমকে আছে।
এদিকে কথ্যরূপে প্রচলিত নৃগোষ্ঠীর অনেক ভাষা ক্রমেই নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে। এর কারণ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মের সদস্যরা এখন নিজের মাতৃভাষার বদলে কথা বলছেন বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায়। পেশাগত প্রয়োজনে বাংলার প্রচলনও বেড়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জীবনে।
বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে সব শিশুকে মাতৃভাষার মাধ্যমে অন্তত প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাদানের অঙ্গীকার করে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার পরিস্থিতি যথাযথভাবে নির্ণয় করা ও তাদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরে ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের নৃভাষা-বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার কাজ হাতে নেয়। ২০১৪ সালে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ব্যয়ে সমীক্ষার কাজ শুরু করে। ২০১৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে এই সমীক্ষার কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তার মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়। ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হয়ে গেলেও সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ ও পাণ্ডুলিপি লিখনের কাজ অব্যাহত থাকে।
কর্মসূচির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১০ খণ্ড বাংলা ও ১০ খণ্ড ইংরেজি প্রতিবেদন মুদ্রণ ও প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে মাত্র একটি খণ্ড প্রকাশের পর আর কাজ এগোয়নি।
এর কারণ জানতে চাইলে ওই সমীক্ষা দলের প্রধান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক ড. সৌরভ শিকদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সমীক্ষার সব প্রতিবেদন যথাসময়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে জমা দিয়েছিলাম। এরপর ২০১৮ সালে একটি খণ্ড প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট। পরে বাকিগুলোর খবর নিয়ে জানতে পারি, আমাদের সমীক্ষার হার্ডকপি পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সফট কপি নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক হাকিম আরিফকে নিয়ে খবর নিলাম। জানতে পারলাম, আমাদের সমীক্ষার হার্ডকপি পড়ে আছে স্টোররুমে।’
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০১৬ সালেই নৃগোষ্ঠীর ভাষা সমীক্ষার কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন ১০ খণ্ডের মধ্যে ৯ খণ্ড বই কেন প্রকাশ করা গেল না, তা পূর্বতন মহাপরিচালকরা বলতে পারবেন।’
পরিচালক আসাদুজ্জামান বলছেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা সমীক্ষায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট তার কাজ বন্ধ করেনি। এখন পাত্র, কন্দ ও রেংমিটচ্য ভাষা ও ভাষার সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারা। পাত্র ভাষা নিয়ে মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ তিনটি ভাষাসহ বাংলাদেশে ১৪টি ভাষা মহাবিপন্ন পর্যায়ে রয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমে এসব ভাষার সমীক্ষা করব। বিপন্নপ্রায় ভাষাগুলোকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাব।’
সরকার চাকমা, মণিপুরি, মারমা, ককবরক, আচিক ও সাদরি ভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেছে; যাতে এসব ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর শিশুরা নিজের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করতে পারে। কিন্তু এ প্রকল্পেও গলদ দেখছেন ভাষাবিদ অধ্যাপক সৌরভ শিকদার। তিনি বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠদানের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। চাকমা, মারমা, ককবরক ভাষার পর্যাপ্ত শিক্ষক তৈরি না হলে শিশুদের পাঠদান করবে কে? এ বিষয়ে সরকারকে আলাদাভাবে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। আমরা এর আগে অনেকবার এই প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কানে তোলেনি।’
এ বিষয়ে আলাপকালে মণিপুরি (মৈতে) ভাষার কবি হাম্মাম সনাতন খবরের কাগজকে জানান, সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার বই প্রণয়ন করলেও প্রান্তিকের স্কুলগুলোতে তা পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছায় না। অনেক ক্ষেত্রে মণিপুরি জনগোষ্ঠীকে অর্থ খরচ করে এসব বই বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার দুর্গম চা-বাগানের অনেক মণিপুরি শিশুকে বই ভাগাভাগি করে পড়তে দেখেছেন এ প্রতিবেদক।
হাম্মাম সনাতন বলেন, ‘আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের প্রশ্ন যেন কেবল সভা-সেমিনারে থমকে আছে। অনেক অনুষ্ঠান হয়। আমাদের ডাকা হয়, কথা শোনা হয়। তারপর আমাদের ভাষা নিয়ে গবেষণা করল নাকি বই বের করল, আমাদের কিছু বলা হয় না। আমরা যারা রাজধানী থেকে দূরে থাকি, প্রান্তিকে বসে নিজেদের ভাষা ও সাহিত্য চর্চা করি, তারা এক রকম ব্রাত্য।’
মৌলভীবাজার চা-জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফ্রন্টের সভাপতি ও সাদরি ভাষার কবি পরিমল সিংহ বাড়াইক বলেন, ‘চা-বাগানে অন্তত ২৯টি ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠী রয়েছে। সরকারি তালিকার বাইরেও অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে; যাদের নিজস্ব মাতৃভাষা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে। আমরা যখন নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ছোটখাটো সম্মেলনের আয়োজন করি, তখন চা-বাগানের ভেতর থেকে কেউ কেউ নিজেদের মাতৃভাষার স্মৃতিচারণ করেন। এখন তো আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি। কারণ এখন ছেলেমেয়েরা সব কথা বলছে সিলেটি ভাষায়, কেউ তো চলতি বাংলাই বলে। আর চা-বাগানের আদিবাসী শ্রমিক কথা বলেন মিশ্র দেশোয়ালি ভাষায়।’