গত সাত মাসে সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য বিলোপের ইস্যুতে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনসহ ঘটেছে নানা ঘটনা। কিন্তু নারীর প্রতি চলে আসা নানা বৈষম্য এখনো দৃশ্যমান এবং এ নিয়ে সরব অবস্থানে নারী ও মানবাধিকারকর্মীসহ অনেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ দেশে বহু আগে থেকে নারীর প্রতি চলে আসা আর্থসামাজিক-আইনগত বৈষম্য রয়েই গেছে। তবে এসব বৈষম্য নিরসনে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন। তারা বলছেন, নারীর প্রতি চলে আসা বৈষম্য নিরসনে কাজ করছে কমিশন।
এমন বাস্তবতায় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও আজ ৮ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য- ‘অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন: নারী ও কন্যার উন্নয়ন’। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা তার বাণীতে বলেন, নারীদের সম্ভাবনা ও কর্মদক্ষতাকে উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ত করে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬। এর মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৯ হাজার ২৬৬, আর নারী ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৮১ হাজার ২২৬ জন। অর্থাৎ দেশে পুরুষের চেয়ে নারী বেশি ১৬ লাখ ১১ হাজার ৯৬০ জন। অন্যদিকে সর্বশেষ ভোটার সংখ্যার হিসাবে এখন দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৩৭ লাখ ৩২ হাজার ২৭৪। এর মধ্যে মোট নারী ভোটার ৬ কোটি ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৬৬ এবং পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৩৩ লাখ ৬১ হাজার ৬১৫ জন। অর্থাৎ ভোটার তালিকাতেও পুরুষের চেয়ে খুব বেশি পিছিয়ে নেই নারীরা।
নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মীরা বলছেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার এই নারীদেরই বঞ্চিত করা হচ্ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক, আইনগত, রাজনৈতিকসহ নানা অধিকার থেকে। তারা বলছেন, সংখ্যায় বেশি হলেও ক্ষমতায়নে পেছনে রাখা হচ্ছে নারীদের। এতে দেশের অর্থনীতি ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি বৈষম্য রোধে আন্তর্জাতিক যে পদক্ষেপগুলো রয়েছে তার মধ্যে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণমূলক পদক্ষেপ হলো জাতিসংঘের ‘নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)’। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সনদটি গৃহীত হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালে এ সনদে স্বাক্ষর করে। স্বাক্ষর করলেও সিডও সনদ পরিপূর্ণভাবে মেনে নেয়নি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সরকার সিডও সনদের ৩০টি ধারার মধ্যে ধারা-২, ১৩(ক), ১৬.১(গ) ও (চ) ধারাগুলোয় আপত্তি জানিয়ে তা অনুমোদন করেনি। পরবর্তী সময়ে সরকার ১৩(ক), ১৬.১(চ) অনুচ্ছেদ থেকে আপত্তি তুলে নেয়। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো আপত্তি থাকা দুটি ধারা হলো-
ধারা-২: বৈষম্য বিলোপ করে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপনের নীতিমালা গ্রহণ। প্রতিটি দেশের জাতীয় সংবিধান, আইনকানুন ও নীতিমালায় নারী ও পুরুষের সমতার নীতিমালা সংযুক্তকরণ ও তার প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইনকানুন, রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। সব ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ। আদালত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নারীকে সব ধরনের বৈষম্য থেকে রক্ষা করা। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নারীর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন রোধ করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া।
ধারা-১৬.১(গ): বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদকালে নারী ও পুরুষের একই অধিকার ও দায়দায়িত্ব নিশ্চিত করা।
নারী অধিকার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীর প্রতি যৌন-শারীরিকসহ নানা নির্যাতন প্রতিরোধ ও বাল্যবিবাহ বন্ধে বিভিন্ন ধরনের আইন করেছে সরকার। নিয়েছে নানা পদক্ষেপ। কিন্তু সিডওর সনদের ওই দুই ধারায় বাংলাদেশ সম্মতি দিলে বড় প্রাপ্তি হতো সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার এবং বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদকালে নারী ও পুরুষের একই অধিকার প্রতিষ্ঠা। কারণ অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া নারী তার বাকি অধিকারগুলো ভোগ করতে পারে না।
সম্পদ ও সন্তানদের ওপর নারীর সমানাধিকার
সিডও সনদে যেমন সম্পদসহ সর্বক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকারের কথা বলা আছে, তেমন বাংলাদেশের সংবিধানেও সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। তার পরও বাংলাদেশের আইনে এখনো নারীরা সম্পদে সমান অধিকার পায়নি। একইভাবে সিডওর সনদে ‘বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদকালে নারী ও পুরুষের একই অধিকার ও দায়দায়িত্ব নিশ্চিত করা’ ধারাটির ওপর সংরক্ষণ দিয়ে রাখায় এখনো নারীরা বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সমানাধিকার পাচ্ছে না। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন জেড আই খান পান্না খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং সম্পত্তিতে এবং সন্তানের অভিভাবকত্বে আইনে নারীরও সমান অধিকার পাওয়ার কথা। তবে এখনো তা হয়নি। আর সম্পদে সমান অধিকার না হওয়ায় নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি হচ্ছে না। এর ফলে বাকি যে সুবিধাই নারীকে দেওয়া হোক, তা সে ভোগ করতে পারছে না।
নারীর প্রতি সহিংসতা
নারীর অধিকার নিশ্চিতে ও তার অগ্রযাত্রায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। পরিসংখ্যান বলছে, এ সহিংসতা কখনো কখনো সংখ্যায় কমে এলেও বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তিত হয়ে সহিংসতা হচ্ছে নারীর ওপর। তেমনটাই বলছে সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপ প্রতিবেদন। এতে উঠে এসেছে গত ১০ বছরে বেড়েছে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার ঘটনা। তবে কমেছে নারীর প্রতি শারীরিক নির্যাতনের সংখ্যা। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘বর্তমানে নারীর প্রতি চলমান সহিংসতা বন্ধ করাই আমাদের কাছে প্রাধান্য তালিকায় প্রথমে আছে। কারণ এটি বন্ধ হওয়া খুব জরুরি। এরপর প্রাধান্য পাবে সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের বিষয়টি। এর মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছে সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার প্রাপ্তির বিষয়টি।’ এ ছাড়া নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন ও বিচারব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা বলেছেন জেড আই খান পান্না। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাশাপাশি যেসব আইন রয়েছে, যেমন নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ আইনের বিচারকালে আসামির জামিন ভিকটিম নারীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে। এ জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট আইনের পরিবর্তন ও সঠিক প্রয়োগ।’
আইনে নারীর প্রতি বৈষম্য
সম্পদ-সম্পত্তি, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদে নারীকে সমান অধিকার দেওয়া, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধানের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের নিচে) মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে আইন করার দাবি জানিয়ে আসছেন নারী ও মানবাধিকারকর্মীরা। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস দেওয়ার বিধান রেখে শ্রম আইনকে নারীবান্ধব করার দাবিও পুরোনো। তবে এসব নিয়ে আলোচনা চলছে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সঙ্গে। নারী অধিকার কর্মীদের আশা, এসব দাবি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে জায়গা পাবে। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষের সদস্য কামরুন নাহার খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেসব অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীরা কর্মরত আছেন, সেগুলোকে শ্রম আইনের আওতাভুক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার দাবিও জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আইএলও সনদ ১৯০-এ অনুস্বাক্ষর করা এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করার কথা বলা হয়েছে।’
রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
বাংলাদেশের সংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে সংরক্ষণ পদ্ধতি থাকলেও তা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করেন নারী অধিকারকর্মীরা। এর মূল কারণ হিসেবে তারা বলছেন, গোটা পদ্ধতিই ত্রুটিপূর্ণ। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি। ভারতের পঞ্চায়েতে এই পদ্ধতি চালু রয়েছে। এতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব আসন থেকে পর্যায়ক্রমে একজন নারী সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ পান। এ বিষয়ে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পলিসি মেকিংয়ে নারীর অংশগ্রহণ না বাড়লে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই রাজনৈতিক দলগুলোতে এবং পলিসি মেকিংয়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন। আমরা দলগুলোর সব ধরনের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ সদস্য নারীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক চেয়েছি। সেটা যদি থাকত, তাহলে হয়তো নারীরা তাদের কথা ও সমস্যা দলীয় এবং সংসদীয় পর্যায়েও বলতে পারতেন। এখন সময় এসেছে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা কতটুকু এগোলাম তা পর্যালোচনা করার। পাশাপাশি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া, যেন নারীর প্রতি চলে আসা বৈষম্য নিরসন হয়।’
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা নারীর প্রতি চলে আসা বৈষম্য বিলোপে যথাসম্ভব কাজ করছি। নারী অধিকারসংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কথা হচ্ছে। যেসব আইনে বৈষম্য আছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এগুলো পরিবর্তনসহ বেশ কিছু পরিবর্তনের সুপারিশ আমরা করব।’
সংগ্রামী নারী
> বিচারক বিচারকইম নারী-পুরুষ নয়: জিনাত আরা
> উচ্চপদে নারী এলে দেশ সমৃদ্ধ হবে: নূরুন নাহার
> সাফল্যের পেছনে কষ্টের গল্প: তাহমিনা আহমেদ
> সব ক্ষেত্রেই নারীর মূল্যায়ন চাই: উমামা ফাতেমা