আসন্ন ঈদুল ফিতর ঘিরে রাজধানীর মিরপুর এলাকার ফুটপাত, বিভিন্ন মার্কেট, শপিংমল ও বিপণিবিতানগুলোতে চলছে জমজমাট বেচাকেনা। কারণ ঈদের দিন পরিবারের সবার পরনে নতুন জামা আর তাদের মুখের হাসি কে না দেখতে চায়? এ জন্য দিনে কিংবা রাতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পদচারণায় মুখর প্রতিটি শপিং জোন। পছন্দের পোশাকটি কিনতে ক্রেতারা ঘুরছেন এক মার্কেট থেকে অন্য মার্কেটে। তবে দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে বিক্রি আশানুরূপ না হওয়ায় হতাশ বিক্রেতারা।
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর এলাকার শাহ আলী মার্কেটে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা, সপরিবারে ঈদের কেনাকাটা করছিলেন। জিজ্ঞেস করতেই তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদে আমি প্রতিবছরই পরিবারের সবার জন্য নতুন জামা কিনি, এবারও কিনছি। শুধু নিজের ছেলে-মেয়ে ও পরিবারের সদস্যদের জন্যই নয়, গরিব আত্মীয়-স্বজনের জন্যও কিনছি। কারণ পরের ঈদে কোরবানি দিতে হয়। এবার ১৫ রমজানের পর থেকে আশপাশের কয়েকটি মার্কেটে ঘুরে কেনাকাটা করছি। লক্ষ্য সাধ্যের মধ্যে ঈদ উপহার দিয়ে সবাইকে খুশি করা।’
ঈদের কেনাকাটা জমে উঠেছে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর সেকশন সড়কের ফুটপাতে অবস্থিত হোপ মার্কেটেও। প্রতিদিন দুপুরের পর বাহারি নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসছেন দোকানদাররা। এসব দোকানে সুঁই-সুতা, জামা-কাপড় থেকে শুরু করে মানুষের নিত্য ব্যবহার্য সব ধরনের জিনিস পাওয়া যায়, দামেও সস্তা। ফুটপাতের হোপ মার্কেটে শপিং করতে আসা রিয়া ও নিশা নামে দুই বোনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, রমজানের শুরুতেই অনলাইন থেকে থ্রি-পিস কিনে বানাতে দিয়েছেন। এখন জামার সঙ্গে মিলিয়ে জুতা, গয়নাসহ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে এসেছেন। আশপাশের অনেক শপিংমল থাকার পরও এই মার্কেটে কেন- এমন প্রশ্নে রিয়া বলেন, ‘আমাদের বাসা মিরপুর-২ নম্বর এলাকায়। পরিবার মধ্যবিত্ত। এখানে (হোপ মার্কেটে) নিয়মিতই আসা হয়। অনেক ধরনের পণ্য পাওয়া যায়, যাচাই করে কিনতে পারি। অন্যান্য মার্কেটের তুলনায় এসব দোকানের পোশাকসহ সব জিনিস মোটামুটি সস্তায় কেনা যায়।’
মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর থেকে শুরু করে ওয়াসার মোড় এবং আইডিয়াল গার্লস স্কুলের গলি পর্যন্ত বিস্তৃত এই হোপ মার্কেট; যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কেনাকাটার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। পণ্যের দাম ও বিক্রি সম্পর্কে জানতে চাইলে শিশু-নারীদের পোশাক বিক্রেতা রমিজ উদ্দিন বলেন- ‘আপা, আমাদের দোকান তো ফুটপাতে। দোকান ভাড়া দিতে হয় না। কোনো কর্মচারী না রাখায় তাদের বেতনও দিতে হয় না। আমাদের এসব দোকানে শুধু ঈদ নয় সারা বছরই কমবেশি বেচা-বিক্রি থাকে। লাভ করি কম, ধরনভেদে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ। বেশি বিক্রিই আমাদের লক্ষ্য। তবে ঈদের আগে গতবারের তুলনায় এবার বিক্রি কম।’ অথচ এই এলাকার অন্য বড় মার্কেটগুলোর চিত্র কিন্তু পুরো আলাদা।
মিরপুর-১১ নম্বর এলাকার নান্নু মার্কেটে গিয়ে দেখা যায় প্রচুর ক্রেতা এসেছেন। ছেলেদের পোশাকের জন্য এই মার্কেট বেশ জনপ্রিয়। সাধ্যের মধ্যে ভালো পোশাক পেতে নান্নুতে ভিড় করেন ক্রেতারা। সেখানে কথা হয় কচুক্ষেত এলাকার বাসিন্দা আসমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুই ছেলের জন্য শার্ট-প্যান্ট কিনতে আসছি। কারণ এই মার্কেটে অনেক নামিদামি ব্র্যান্ডের জামাও মোটামুটি কম দামে পাওয়া যায়। ঈদ ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ও এখানে বাচ্চাদের জামা কিনি।’ এই মার্কেটে ভালো মানের টি-শার্টের দাম ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকা। শার্ট ২৫০ থেকে ৮০০ টাকা, হাফহাতা শার্ট ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা, পাঞ্জাবি ৮০০ থেকে দেড় হাজার টাকা, ফরমাল প্যান্ট ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, জিনসের প্যান্ট ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, গ্যাবার্ডিন প্যান্ট ৪৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, ট্রাউজার ৩০০ টাকা এবং ব্লেজার পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকায়।
নান্নু মার্কেটের অদূরেই রয়েছে শিশু ও নারীদের নানা পোশাকের সম্ভারে সাজানো মোহাম্মদীয়া মার্কেট ও দেলোয়ার মার্কেট। যেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে সেলাই ছাড়া জমকালো কাজের থ্রি-পিস। এ ছাড়া হাজার টাকায় লেহেঙ্গা, ফ্রক, টপ, প্যান্ট, শাড়ি ও শিশুদের ফ্যাশনেবল নানা পোশাকও পাওয়া যাচ্ছে। ফার্মগেট থেকে মোহাম্মদীয়া মার্কেটে শাড়ি কিনতে এসেছেন মিতা। তিনি জানান, পছন্দসই শাড়ি কম দামে কিনতে এই মার্কেটে এসেছেন। আর দেলোয়ার মার্কেটে পাওয়া যায় আড়ংয়ের মানের গজ কাপড়। এ ছাড়া রয়েছে দেশীয় কাপড়ে তৈরি মেয়েদের ওয়ান পিস। সরেজমিনে দেখা যায়, অল্প কিছু দোকান। অথচ রুচিসম্পন্ন ক্রেতার ভিড়ে ঠাসা। শুধু খুচরা ক্রেতাই নন, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও এখান থেকে কাপড় নিয়ে পোশাক তৈরি করে বিক্রি করেন। কারণ দেলোয়ার মার্কেটে মাত্র ৭০ থেকে ১০০ টাকায় গজ কাপড় কিনে বানানো যায় পছন্দের পোশাক। এ ছাড়া এই মার্কেটগুলোর আশপাশ ও অলিগলির দুইপাশে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে পোশাক ফিটিংয়ের দোকান। এসব দোকানে মার্কেট থেকে কেনা পছন্দের পোশাক ফিটিং করে নিতে পারেন বিক্রেতারা।
এ ছাড়া মিরপুর-২ নম্বর রাস্তার দুইপাশজুড়ে চন্দ্রবিন্দু, নবরূপ, স্বেতজ, দ্বেসজ, রিচম্যান, দর্জিবাড়ি, নোঙর, ম্যানলি, প্রথমা দেশীয় ব্র্যান্ড, এফএস স্কয়ার, ১ নম্বর সনি সিনেমা হল মোড়ের মিরপুর নিউ মার্কেট, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট, মিরপুর শপিং সেন্টার কমপ্লেক্স, রূপায়ণ ও লতিফ শপিং সেন্টার ক্রেতা-দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর। সবখানে একই চিত্র। এসব বিপণিকেন্দ্রে সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চলছে জমজমাট বেচাকেনা।