পেট্রোবাংলার অধীনস্ত কোম্পানি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) দরপত্রে ভুয়া ও ঠিকানাবিহীন কাগজপত্র দিয়ে দরপত্রে অংশ নেয় টেকনো স্টেম এনার্জি। পরবর্তী সময়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে জমা দেওয়া জামানতের সাড়ে ১২ কোটি টাকাও আত্মসাৎ হয়ে যায়।
অভিযোগ উঠেছে, এই সবকিছুই হয়েছে বিজিএফসিএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌফিকুর রহমান তপু, সাবেক মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) আলী মোক্তেজার ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক আবুল জাহিদের যোগসাজশে। ২০২০ সালে পেট্রোবাংলার অভ্যন্তরীণ তদন্তে পরস্পর যোগসাজশে রাষ্ট্রের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ওই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে ওই তিন কর্মকর্তা চাকরির মেয়াদ শেষে অবসরে গেছেন। এদিকে, বিষয়টি আমলে নিয়ে ২০২২ সালে অনুসন্ধানও শুরু করেছিল দুদক। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে আজও সেই অনুসন্ধানের ফল পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, পেট্রোবাংলায় ভুয়া প্রতিষ্ঠান টেকনো স্টেম এনার্জির জমা দেওয়া দরপত্রের জামানত সাড়ে ১২ কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ দিয়ে ৩ কোটি টাকার অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন ওই তিন কর্মকর্তা। অভ্যন্তরীণ তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ফাইলটি নথিভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন পেট্রোবাংলার তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) নাজমুল আহসান। বর্তমানে এই কর্মকর্তা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, পেট্রোবাংলার সাবেক প্রভাবশালী এই পরিচালক শুধু অনিয়মকে ধামাচাপাই দেননি, তদন্তে প্রমাণিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের সব অনিয়মের ফাইল নথিভুক্ত করে ডিপফ্রিজে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এতে অভিযুক্তরা শুধু বহালই থাকেননি, নির্ধারিত সময় পার করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তারা অবসরেও চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) ও পানিসম্পদ সচিব নাজমুল আহসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। দেখে বলতে হবে। কিন্তু এমন কোনো ঘটনায় মনে হয় না আমার কোনো বিষয় ছিল। তবে কোনো কিছুই আইনের বাইরে হয়নি, যা হয়েছে আইনের মধ্যেই হয়েছে। তা ছাড়া পরিচালকের (প্রশাসন) কিছু করণীয় নেই। চেয়ারম্যান যিনি ছিলেন নিশ্চয়ই তার বিষয় ছিল।’
জানা গেছে, এসব অভিযোগ পরবর্তী সময়ে পেট্রোবাংলার অভ্যন্তরীণ তদন্ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসের পাঠানো চিঠিতেও সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান টেকনো স্টেম এনার্জির কাগজপত্র ভুয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ আছে, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরীর আস্থাভাজন হওয়ায় গত সরকারের আমলে (১৫ ডিসেম্বর ২০২২) পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে পদোন্নতি ও নিয়োগ পান পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক নাজমুল আহসান।
এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিজিএফসিএলের বাস্তবায়নাধীন ‘তিতাস গ্যাস ফিল্ডের লোকেশনে ওয়েল হেড কম্প্রেসর স্থাপন’ প্রকল্পটির মেয়াদকাল ছিল জুলাই ২০১৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত। প্রকল্পটির আওতায় বিজিএফসিএলের তিতাস গ্যাস ফিল্ডের লোকেশন এ- ‘ওয়েলহেড কম্প্রেসর কেনা, স্থাপন, টেস্টিং, কমিশনিং, অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স’ কাজের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা টেকনো স্টেম এনার্জি, ইউএসএ নির্বাচিত হয় এবং এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, পেট্রোবাংলা ও বিজিএফসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যোগসাজশে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেন।
অধিকন্তু সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান টেকনো স্টেম এনার্জিকে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী পরবর্তী ২৮ দিনের মধ্যে বিজিএফসিএলের অনুকূলে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি দিতে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় দরপত্রদাতার দরপত্র জামানত সাড়ে ১২ কোটি টাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিজিএফসিএলের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা আত্মসাৎ করেছেন বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
অনিয়মের ধারাবাহিকতায় দেখা গেছে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান টেকনো স্টেম এনার্জির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিজিএফসিএলের ৯০০ কোটি টাকার প্রকল্পের ‘ওয়েলহেড কম্প্রেসর কেনা, স্থাপন, টেস্টিং, কমিশনিং, অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স’ কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। অথচ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডি বিভাগের সিপিটিইউ শাখার নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া (কার্যাদেশ) দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টেক) সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা কাগজপত্র অবশ্যই যাচাই-বাছাই করবে এমন নির্দেশনা রয়েছে। এমনকি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দরপত্র শিডিউলের ৬৩.৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যোগ্যতা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি দরপত্রদাতার অফিস পরিদর্শন করবে ও উচ্চমূল্য এবং জটিল কাজের প্রকল্পের ক্ষেত্রে দরপত্র মূল্যায়নের সময় দরপত্রের সঙ্গে থাকা তথ্য যাচাই করতে হবে।’ অথচ এর কোনোটাই করা হয়নি বলে উল্লিখিত দরপত্রে এমন অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে পেট্রোবাংলার নিজস্ব তদন্তে। তাছাড়া মূল্যায়ন কমিটির সদস্য বিজিএফসিএলের জেনারেল ম্যানেজার আমির ফয়সল এক চিঠিতেও স্বীকার করেছেন, দরদাতা প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়নি।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাস এক চিঠিতে জানিয়েছে, টেকনো স্টেম এনার্জি অফিশিয়াল ঠিকানা দিয়েছে, নং. ১৮০০ বেরিং ডিআর. স্যুইট ৯৩৫, হিউসটন টেক্সাস ৭৭০৫৭, ইউএসএ দিয়েছে। অথচ সশরীরে গিয়ে তদন্ত করে জানা গেছে, সেই ঠিকানায় টেকনো স্টিম এনার্জির কোনো অস্তিত্ব নেই। হিউস্টনে বাংলাদেশের অনারারি কনসাল জেনারেল (মনোনীত) মার্টি ম্যাকভির অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এই চিঠিটি ২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) পঞ্চম সভায় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান (নোয়া) শর্ত অনুযায়ী কার্যাদেশ পাওয়ার পরবর্তী ২৮ দিনের মধ্যে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি দাখিলে ব্যর্থ হওয়ায় দরপত্রদাতার দরপত্র জামানতের (Bid Security) সাড়ে ১২ কোটি টাকা বিজিএফসিএলের অনুকূলে নগদায়ন না করার কারণসহ সামগ্রিক ক্রয় প্রক্রিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংশ্লিষ্টদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সুপারিশ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) তোফায়েল আহমেদকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই কমিটি বিজিএফসিএলের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের দরপত্র জামানত নগদায়ন না করার দায়-দায়িত্ব নির্ধারণসংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের দরপত্র জামানত নগদায়ন না করায় সরকারের সাড়ে ১২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ওই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সচিব ও সাবেক মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আমজাদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আপনি বর্তমান মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. জাভেদ ইবনে শাহেদকে জিজ্ঞেস করেন।’