২০২৪ সালে বাংলাদেশে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহে বড় ধরনের ধস নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নিট এফডিআই কমে দাঁড়িয়েছে ১২৭ কোটি ডলার, যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছরের তুলনায় এ সময়ে এফডিআই কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগ কমলেও এ সময়ে দেশের বাইরে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমলেও বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এফডিআই-সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৪৬ কোটি ডলার। সেই হিসাবে মাত্র এক বছরে ১৯ কোটি ডলার বা ১৩ শতাংশ বিনিয়োগ হারিয়েছে দেশটি। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিপিএম-৬ অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিট বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১৫১ কোটি ডলার। ২০২১ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৫৭ কোটি ডলার। আর কোভিড-১৯-এর সময়ে সবচেয়ে কম বিনিয়োগ এসেছিল। তখন এর পরিমাণ ছিল ১৪৬ কোটি ডলার। ২০১৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৮৫ কোটি ডলার। সেই হিসাবে গত ছয় বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে সবচেয়ে কম নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট বিনিয়োগের হিসাব হলেও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গ্রস হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে জানা গেছে, সেই হিসাবেও এবার বিদেশি বিনিয়োগ কম এসেছে।
নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমার পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং নীতিগত অস্বচ্ছতা দায়ী বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ এবং দেশীয় উদ্যোক্তারা। তারা যে কারণগুলো শনাক্ত করেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন, বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিবেশ, জটিল করনীতি ও উচ্চ করহার, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, নীতি বাস্তবায়নে ধীরগতি, ঠিকমতো ওয়ান স্টপ সেবা চালু না করা, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামো খাতের দুর্বলতা, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপির উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়া, ব্যবসার খরচ বেশি হওয়া, বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার দুর্বলতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ইত্যাদি। তাদের মতে, যতদিন বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না করা হবে, ততদিন এ দেশে প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ না থাকলে কখনোই বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে না। কেবল সস্তা শ্রমের প্রস্তাব দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন প্রযুক্তির যুগ। কাজেই নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার না করতে পারলে কেবল সস্তা শ্রম দিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যাবে না। এ ছাড়া বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা এখনো আশানুরূপ নয়। তাই বাংলাদেশে যদি আরও বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হয়, তাহলে বন্দরের ব্যবস্থাপনা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এই প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়বে না, স্থানীয় বিনিয়োগ না বাড়লে কখনোই বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে না। আর বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। সর্বোপরি কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে না। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী দিনে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে।
একই বিষয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ না আসার অনেক কারণ আছে। এর অন্যতম ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন। করনীতির কিছু জায়গা আবার সাংঘর্ষিক। করহার বেশি। দুর্নীতি একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি। ওয়ান স্টপ সার্ভিস যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবে হচ্ছে না। এ ছাড়া কোভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপীই বিনিয়োগ কম হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক বিনিয়োগকারীকে সেবা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘোরাঘুরি করতে হয়। বিদেশিরা চান এক জায়গা থেকে সব সেবা পেতে। কিন্তু তারা তা পান না। ফলে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। এ ছাড়া আমাদের পণ্য পরিবহনের খরচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এই খরচ কমানোর কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি।’ এটিও বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম বাধা বলে মনে করেন তিনি।
সম্প্রতি হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে অবশ্যই নিজের দেশকে তুলে ধরতে হবে। কিন্তু এর সঙ্গে বিনিয়োগের বাধাগুলোও দূর করতে হবে। আমাদের দেশে কাগজে-কলমে সবকিছুই খুব ভালো। বাস্তবায়নে তার উল্টো প্রয়োগ দেখা যায়।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এফডিআই সাধারণত তিনটি খাতে আসে। প্রথমত, ইক্যুইটি ক্যাপিটাল, পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা এবং কোম্পানিভিত্তিক ঋণ। এই তিনটি ক্ষেত্রেই ২০২৪ সালে বিনিয়োগ কমেছে। ইক্যুইটি ক্যাপিটাল ২০২৩ সালের তুলনায় কমেছে দশমিক ৪২ শতাংশ, পুনর্বিনিয়োগ কমেছে ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং কোম্পানিভিত্তিক ঋণ কমেছে প্রায় ২ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ কমেছে নন-ইপিজেড এলাকায়, যেখানে মোট নিট এফডিআই ৮৫ কোটি ডলারে নেমে এসেছে; যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩১ শতাংশ কম। ইপিজেড এলাকায় বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ডলার এবং ইকোনমিক জোনে মাত্র ১০ কোটি ডলার, যা মোট বিনিয়োগের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ।
এ ছাড়া যেসব দেশ থেকে বিনিয়োগ আসে, তার প্রায় সবগুলো থেকেই বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে। বিনিয়োগে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে ছিল যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভারত। সব দেশ থেকেই বিনিয়োগ কম এসেছে। এফডিআইয়ের বড় অংশই এসেছে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে। বিশেষ করে ব্যাংকিং, পোশাক ও চামড়াশিল্পে। ব্যাংকিং খাতে এসেছে প্রায় ৪১ কোটি ডলার, যা সর্বোচ্চ। তার পরই রয়েছে পোশাক খাত, যেখানে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি ডলার। চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে এসেছে ১৩ কোটি ডলার এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৭ কোটি ডলার।
এই প্রবণতাকে উদ্বেগজনক মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগের এই ধস দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এফডিআই কেবল বিনিয়োগই নয়, বরং প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও কর্মসংস্থানও তৈরি করে। তাদের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য যে বাধাগুলো তার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘায়িত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা, মুনাফা স্থানান্তরের জটিলতা, বিচারব্যবস্থার ধীরগতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এসব কারণে অনেকে বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ভাবছেন।
বিদেশি বিনিয়োগে আস্থা ফেরাতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, কর কাঠামোতে সুবিধা দেওয়া, ওয়ান স্টপ সেবা চালু এবং অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর বিদেশে বিনিয়োগ সম্প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৪৭ সালের নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের ফলে ২০১৫ সালে রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের জন্য সীমিত আকারে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে দেশের বাইরে মোট নিট এফডিআই আউট ফ্লো হয়েছে ৭১৬ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৮ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।