দেশের রাজনীতির মাঠে শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। চলমান জুলাই পদযাত্রায় সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটিকে নিয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) সাম্প্রতিক জরিপে ১৫ শতাংশ ভোট এনসিপির পক্ষে যাওয়ার বিষয়টিও দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল বাড়াচ্ছে।
এদিকে দলটির সাম্প্রতিক সময়ে কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও তাদের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন। তারা বলছেন, বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মন জয় করতে পারলে এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ খুব একটা মন্দ নয়। বিদ্যমান গণসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে জায়গা করতে পারলে রাজনৈতিক পরিসরে বিভিন্ন ইস্যুতে এনসিপির দর-কষাকষির সুযোগ বাড়বে বলে মনে করেন তারা।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এনসিপি জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। মিটিং করে বক্তৃতা না দিয়ে তৃণমূলে গেলে জনসমর্থন পাওয়া যায়। জরিপে যদি তিন মাসে ১৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পায়, এটাকে আমি বলব সাংঘাতিক অগ্রগতি। সুতরাং এনসিপি নির্বাচনের সময় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। জুলাই সনদও তারা ঘোষণা করবে। আসলে বাংলাদেশে যে অভ্যুত্থানটি হয়েছে আপামর জনসাধারণ বিশেষ করে যেখানে প্রান্তিক লোকজন সম্পৃক্ত হয়েছিল তারা এনসিপির মধ্যে নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে পায়। যেটা অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত দলে পাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘এনসিপির তৃণমূলে গিয়ে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা- এটা আমাদের রাজনীতিতে ইতিবাচক সংস্কৃতি।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে তাদের দোরগোড়ায় যেতে হবে। এনসিপি তো কিছুটা ভুলভ্রান্তি করেছে। এখন মনে হচ্ছে তারা শোধরানোর চেষ্টা করছে। সময়ই তা বলে দেবে। পত্রিকার খবরের মাধ্যমে যা দেখতে পাচ্ছি, মনে হচ্ছে তারা জনগণের সাড়া পাচ্ছে। মানুষের সমর্থন আছে তাদের প্রতি, এটা মনে হয়।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, “জুলাই আন্দোলনের ফসল হিসেবে দেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে এনসিপির অভ্যুদয় ‘নতুন বাংলাদেশে’ বহুমাত্রিক সম্ভাবনার অন্যতম ক্ষেত্র। যৌক্তিক কারণেই তাদের মূল চ্যালেঞ্জ দীর্ঘকালের পুঞ্জীভূত কলুষিত রাজনীতির রোল মডেল পরিহার করে দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, ট্যাগতন্ত্র ও মবতন্ত্রের মতো অপশক্তির প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের পরিচিত করানো। রক্তক্ষয়ী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল চেতনার ধারক হিসেবে জনগণের মালিকানার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মশালধারী রাজনৈতিক শক্তির দাবিদার হলেই চলবে না, সব শ্রেণি, পরিচয় ও বৈচিত্র্যের মানুষের সমঅধিকার ও সহ-অবস্থানমূলক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অভীষ্ট অর্জনের চালিকাশক্তি হিসেবে নতুন ধারার রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনের অংশীদাররাই যেমন তাদের মূল সমর্থক গোষ্ঠী, তেমনি একই অংশীজন তাদের সবচেয়ে বড় ওয়াচডগ, যারা তাদের যেমন বরণ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে, তেমনি অতি সহজেই তাদের প্রত্যাখ্যানও করতে পারে।”
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচি চলছে এনসিপির। গত ১ জুলাই শহিদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ শীর্ষক কর্মসূচি।
বুধবার (৯ জুলাই) পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী দেশের তিন ভাগের এক ভাগ জেলায় (২২টি) জুলাই পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
‘জুলাইয়ের সন্তানেরা আসবে দ্বারে দ্বারে, ক্ষমতা আসুক নেমে জনতার কাতারে’ শিরোনামে নির্মিত দলটির ১ মিনিট ৩ সেকেন্ডের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে।
জুলাই পদযাত্রার সার্বিক বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এনসিপিকে মানুষ সমর্থন দেবে এটা আমাদের আত্মবিশ্বাস ছিল। জুলাই পদযাত্রায় এসে আমাদের সেই আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের যুবক, বৃদ্ধ, শিশু থেকে শুরু করে সবাই আমাদের সমর্থন জানাচ্ছেন। তারা পরিবর্তন চান। এনসিপিকে মাঠে আরও দৃশ্যমান দেখতে চান। গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা নাহিদ, হাসনাত, সারজিসদের সরাসরি দেখে মানুষ আরও উচ্ছ্বসিত। সবাই আমাদের আরও দম নিয়ে রাজনীতির মাঠে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।’
এনসিপির একাধিক নেতা জানান, জুলাই পদযাত্রায় অভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার ও আহতদের পরিবারকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই সব পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এনসিপির নেতারা মতবিনিময় করছেন। খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। জেলা-উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে সমাবেশ। বিভিন্ন বাজার, চায়ের দোকান ঘুরে সর্বস্তরের লোকজনের সঙ্গে তারা ভাববিনিময় করছেন। অনেকে গণ-অভ্যুত্থানে তাদের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে জানতে চান। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও শিক্ষার্থীরাও ছুটে আসছেন।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের (খ্রিষ্টান, সাঁওতাল) প্রতিনিধিদের সঙ্গেও দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম কথা বলছেন।
অন্যদিকে দলের নারীনেত্রীদের নিয়ে মানুষকে আলাদা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ছুটে আসছেন বিভিন্ন বয়সের নারীরা। জুলাই পদযাত্রা নিয়ে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবীন ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘পথসভাগুলোতে মানুষের ঢল নামছে সেটার ছবি ভিডিও পাচ্ছি আমরা কিন্তু মাইলের পর মাইল হাঁটার সময় বাসা-বাড়ির বারান্দায় ছাদে মা, কিশোর কিশোরী, বয়স্ক ও মুরব্বি শ্রেণির মানুষের দাঁড়িয়ে থাকা, সালাম দেওয়া-নেওয়া, হাসিবিনিময়- এসবের অনুপ্রেরণা অনন্য লেভেলের। কারণ স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন যেন দুর্লভ হয়ে গিয়েছিল এই দেশে। অরাজনৈতিক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সমর্থন বহু বছর যেন বাংলাদেশের রাজনীতি দেখে না। এনসিপি ধন্য, শুধু নিজেদের প্রমাণ করে করে সামনে এগোনো।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রাজধানীতে পয়লা বৈশাখসহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে এনসিপির লোকসমাগম কিছুটা কম হওয়ায় বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়। এই সময় কেউ কেউ এনসিপির পক্ষে রাজনৈতিক মাঠে অবস্থান করা সম্ভব কি না, এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। এমন পরিস্থিতিতে এনসিপির শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাদের তৃণমূল পর্যায়ে অবস্থান তৈরির পরামর্শ দেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে বলেন। তারপর থেকে এনসিপিকে দলের নিবন্ধন আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণে কাজ করতে দেখা যায়। তারই অংশ হিসেবে জেলা ও উপজেলায় কমিটি গঠন করা হয়। গত ২৯ জুনের তথ্য অনুযায়ী ৫টি মহানগর কমিটি, ৩৪ জেলা কমিটি, ১৯০ উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া গঠন করা হয়েছে ১৪টি সেল ও ১০টি উইং।
জুলাই পদযাত্রার আগে গঠিত এসব কমিটির সদস্যরা কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নতুন নেতারা সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডে সংগঠনের পরিসর বাড়াচ্ছেন। কর্মসূচির ছবি, ভিডিও দেখে নতুন করে ভাবছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। অনেকে বলছেন, ৬৪ জেলায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফরে যাওয়া সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত। জুলাই পদযাত্রা শেষ করে দলটি নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবে। তখন তাদের পক্ষে কর্মসূচি গ্রহণ করা অনেক সহজ হবে।
গত ৭ জুলাই প্রকাশিত সানেম এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জরিপের ফলও এনসিপিকে আশা দেখাচ্ছে। সেই জরিপ অনুযায়ী আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি ৩৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ, জামায়াত ২১ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং এনসিপি ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট পাবে।
দলের যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পদযাত্রা আমাদের ব্যাপক আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন প্রমাণ করছে, তারা জুলাই হত্যার বিচার এবং সংস্কার চান। এই ইস্যুতে আমাদের কর্মসূচি আরও জোরালো হবে। নির্বাচনি জোট নিয়ে আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই।’