জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে গলদঘর্ম শিক্ষা প্রশাসন। মঙ্গলবারের (২২ জুলাই) নির্ধারিত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত আসে মাত্র ৭ ঘণ্টা আগে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের এমন দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। আন্দোলনের মুখে প্রত্যাহার করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবকে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি বলব এটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা। সরকারের প্রশাসনিক জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত আসা দরকার ছিল। প্রয়োজন ছিল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত। পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা ছিল। শিক্ষার্থীদের আবেগও কাজ করেছে। সেই বিবেচনা থেকে পরীক্ষা পেছালে কেউ আপত্তি করত না।’
শিক্ষা প্রশাসনের এমন ব্যর্থতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ইন্টেরিম সময়ে যে ধরনের যোগ্য লোক দরকার উপদেষ্টা পরিষদে সে রকম লোক নেই। এ কারণে এ রকম হচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নেই। শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ থাকবে কীভাবে?
তিনি বলেন, অনেক কমিশন হল। কিন্তু শিক্ষা কমিশনই করা হল না। অথচ শিক্ষার্থীরাই জীবন দিল। শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বৈরাচারকে হটানো হলো। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। শিক্ষার প্রতি মনোযোগ, ভালোবাসার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এই ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নিতে সরকার দেরি করছে।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঢাকার চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিভাগের ডিসিদের জানিয়ে দিই। আর অন্য শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের অবগত করি। যেন তারা ব্যবস্থা নিতে পারেন।’ পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়টি দেরিতে জানানো নিয়ে তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় নেয়।
গত সোমবার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। এতে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী হতাহত হয়। খুদে শিক্ষার্থীদের আগুনে ঝলসে যাওয়ার ভয়াবহ দৃশ্য দেখে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন সবাই। অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও শোকে পাথর হয়ে যান। স্বভাবতই তার পরের দিন এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করার জন্য শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা অনুরোধ করতে থাকেন। কিন্তু শিক্ষা উপদেষ্টা, সচিব বা শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসছিল না। তারা পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে অনড় থাকেন। নটর ডেম কলেজ, ধানমন্ডি আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বেশ কয়েকটা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বিবৃতি দেয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ভয়ংকর একটি ট্র্যাজেডির পরেও ২২ জুলাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত না করায় শিক্ষার্থীরা বিস্মিত ও মর্মাহত। মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে এমন শোকাবহ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার আগে এক দিন সময় থেমে দাঁড়ানো উচিত- শ্রদ্ধা, সংহতি ও সহানুভূতির জায়গা থেকে।
তাদের এই বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। অনেকে প্রশ্ন তোলেন এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের। রাত ৩টায় পরীক্ষার্থীরা যখন ঘুমাচ্ছে তখন সরকার সিদ্ধান্ত জানায় যে, পরীক্ষা হবে না। সবাই প্রশ্ন তোলে, কেন এই সিদ্ধান্ত আরও আগে নেওয়া হলো না।
একজন অভিভাবক লিখেছেন, এই ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো কীভাবে সকালবেলা এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারবে? নিজের শিক্ষক, জুনিয়র, বন্ধুদের হারিয়ে এমন ভয়াবহ মানসিক অবস্থায় ওরা কীভাবে বোর্ড পরীক্ষা দেবে?
অভিভাবকরা বলছেন, সরকার শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিল না। যখন সবদিক থেকে সমালোচনা হলো, কলেজগুলো পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিচ্ছে তখন নেওয়া হলো স্থগিতের সিদ্ধান্ত। পরীক্ষার্থীরা যখন ঘুম ভাঙার পর পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানবে, তখন তাদের কী অবস্থা হবে? এটি ট্রমার মধ্যে আরও ট্রমা।
অপরদিকে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা আসে তথ্য উপদেষ্টা ও স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার কাছ থেকে, যা শিক্ষা উপদেষ্টার বরাতে। শিক্ষার বিষয় শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে না আসাটারও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।
২০২০ সালের ৮ মার্চ। এই দিন দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণের রোগী শনাক্ত করা হয়। এরপর থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার দাবি জানান অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সরকার সেই সব দাবি আমলে নেয়নি। সাড়া না পেয়ে নিজেরাই ক্লাস বর্জন করা শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীরা। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের জন্য আহ্বান জানান বিশেষজ্ঞরা। ১৪ মার্চ করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ক্যাম্পাস বন্ধের দাবিতে অনশনে বসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চার শিক্ষার্থী। এরপর সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।
এ ছাড়া তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ ও বন্যার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। এমনকি অভিভাবকরা কর্মসূচিও পালন করেন।
বৃহস্পতিবারের পরীক্ষাও স্থগিত
২৪ জুলাইয়ের নির্ধারিত পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞেপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, আগামী ২৪ জুলাই বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য সকল শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনিবার্য কারণবশত নির্দেশক্রমে স্থগিত করা হলো। স্থগিত হওয়া পরীক্ষার পরিবর্তিত সময়সূচি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পরে জানিয়ে দেওয়া হবে।