বেতগ্রাম-তালা-পাইকগাছা-কয়রা সড়কটি খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ১৮ মাইল হিসাবে খ্যাত। ৬৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কপথে শিবসা ও কয়রা সেতু নির্মিত হয়েছে দেড় দশক আগে। কিন্তু সড়কটি যথাযথ প্রশস্ত না হওয়ায় যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতেন মানুষ। ২০১৯ সালে এই সড়ককে আঞ্চলিক মহাসড়কে উন্নীত করার লক্ষ্যে ‘বেতগ্রাম-তালা-পাইকগাছা-কয়রা সড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’ প্রকল্প গ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে যাত্রা শুরু করা প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয় চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু এই দফাতেও শেষ হয়নি পুরো কাজ। প্রকল্প কার্যালয় জানিয়েছে, ৬৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বারবার গতি হারানো এই প্রকল্পের মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানোর আবেদন স্থগিত হয়ে গেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। অর্থ বিভাগও অর্থ ছাড় করতে নারাজ। প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে গেলে গত চার বছরে সরকারের বিনিয়োগ করা ২১৯ কোটি ৯২ লাখ টাকাও গচ্চা যাবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গড়িমসি, শেষে জানা যায় তারা দেউলিয়া।
প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজ প্রতিটি প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় করেছে। বিভিন্ন নথিপত্র থেকে জানা যায়, প্যাকেজ-১-এর আওতায় ১১ কোটি ৯২ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করা হয়েছে। প্যাকেজ-২-এর আওতায় ১১ কোটি ৫ লাখ টাকা, প্যাকেজ-৩-এর আওতায় ১০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে।
প্যাকেজ-৫-এর কাজ শুরু হয় নির্ধারিত সময়ের ১১৯ দিন পরে। তাতেও মোজাহার এন্টারপ্রাইজের গাফিলতির প্রমাণ মিলে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ৮০ শতাংশ কাজ বাকি রেখে চলে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে তারা কাজ বন্ধ রেখেছিল। জমি অধিগ্রহণ বাকি রয়েছে- এমন যুক্তি দেখিয়ে তারা কাজ করতে চাইছিল না। কিন্তু যেসব অংশে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে, সেসব অংশে কার্পেটিং বা সার্ফেসিংয়ের মতো কাজ হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের। প্রকল্প কর্মকর্তারা ঠিকাদারের এমন কাণ্ডে চরম বিপাকে পড়েন।
গত ৫ আগস্টের পর মোজাহার এন্টারপ্রাইজকে দেউলিয়া ঘোষণা করে ব্যাংক। এরপর এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়। এখন নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুঁজতে প্রকল্প কর্মকর্তারা উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করবেন বলে জানিয়েছে সওজের খুলনা জোন।
প্রকল্প কর্মকর্তা খুলনা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী (সওজ) মো. তানিমুল হক জানান, গাফিলতির জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানার নোটিশ পাঠানো হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গত চার বছরে অনেক অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সওজ কেন তাদের ওপর ভরসা রেখেছে- এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি সওজ কর্মকর্তারা।
প্রকল্প এগোয় না, খরচ হয় কোটি কোটি টাকা
সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন বলছে, সওজের এ সড়ক প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করার কথা ছিল, তা যথাযথভাবে হয়নি। আবার যতটুকু বরাদ্দ হয়েছে, তা প্রকল্পের ধীরগতির কারণে খরচ করা যায়নি।
২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ের আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু কোনো অর্থ ব্যয় করা যায়নি। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৪৭ কোটি টাকা আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়; খরচ হয় মাত্র ১৫ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১৪ কোটি টাকা। সেই অর্থবছরে ব্যয় বাড়ে, খরচ হয় ১৪০ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪২ কোটি টাকা খরচ করেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। এর অধিকাংশ অর্থ খরচ হয় আগের অর্থবছরের বিভিন্ন প্যাকেজের বিল পরিশোধে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭০ কোটি টাকা; কিন্তু প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ১৯ কোটি টাকা। এ বছরে মাত্র ৩ দশমিক ৯৩ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য কোনো পরিকল্পনা সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (আরডিপিপি) ছিল না। এই অর্থবছরে অর্থ বিভাগ আর কোনো অর্থ ছাড় করেনি।
প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই প্রকল্পে যখনই গতি কমে এসেছে তখন সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (আরডিপিপি) অর্থ বরাদ্দ কমেছে।
৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকার অডিট আপত্তি
গত ২০২০-২১, ২০২১-২২, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নানা কর্মকাণ্ডে ৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকার অডিট আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিএজি)।
২০২০-২০২১ অর্থবছরে ২টি আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। যার মধ্যে একটি ছিল, চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে ঠিকাদারের বিমা না করা। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ২০ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। অন্য আপত্তি ছিল সড়ক মেরামত কাজে কালভার্ট নির্মাণ অংশে অতিরিক্ত চুক্তি সম্পাদন। এ কারণে ৩৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।
২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৮৭ লাখ টাকা অনিয়মিত ব্যয় নিয়ে অডিট আপত্তি ওঠে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৩টি আপত্তি উত্থাপিত হয়। আপত্তিগুলোর মধ্যে ১টি ছিল স্যালভেজ মালামালের (আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত, অকেজো) ওপর আয়কর ও ভ্যাট কর্তন না করা। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ২৭ লাখ টাকা। স্ট্যান্ডার্ড স্পেসিফিকেশন অপেক্ষা অধিক পুরুত্বে নির্মাণ করায় অডিট আপত্তি আসে। এতে সরকারের ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ক্ষতি হয়। বিলের ভাউচার যথাযথ উপস্থাপন না করার কারণে প্রকল্পের তহবিলে ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার গরমিল দেখা দিয়েছে।
প্রকল্প কর্মকর্তাদের ভাষ্য
সওজের খুলনা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন, খুলনা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমুল হকের সঙ্গে এই প্রকল্পটির বিষয়ে কথা হয়। তারা জানান, জুনে প্রকল্পের মেয়াদ ফুরানোর আগে তারা আরও এক দফা মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করেছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। গত মে মাসে আবেদন করা হলেও এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশে যে পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হবে তার আর্থিক মূল্য ৩৯ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগ এই অর্থ ছাড় না দিলে জমি অধিগ্রহণ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করতে হবে।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি না করলে তারা নতুন করে আর অর্থ ছাড় করবে না। সে ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ বন্ধ করতে হবে। প্রকল্পে ৩৭টি স্পটে দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক পুনর্নির্মাণের কথা ছিল। মাত্র ৭টি স্পটে বাঁক ঠিক করা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় ৩০টি স্পটে বাঁক ঠিক করা যায়নি। অর্থ ছাড় না হলে এই অবস্থাতেই কাজ শেষ করে দেওয়া হবে।
ইতোমধ্যে এই প্রকল্পে সরকারের ২১৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমইডি। এখন প্রকল্প বাতিল হলে সেই অর্থের পুরোটাই গচ্চা যাবে।