তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে দেশের উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্পের অনুমোদন দেয় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার। ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এর অনুমোদন দেওয়া হয়। সে সময় খরচ ধরা হয় ২০ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা শেষ করতে বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সাড়ে ৫ বছরে ১ শতাংশ কাজও হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ২৩টির। মাত্র ৫টির অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। তবে প্রকল্পটি প্রণয়নে সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে ৬৪ জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর।
প্রকল্পটির অনুমোদনের পর সভা শেষে সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছিলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন (দ্বিতীয় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পটি একটি স্টার প্রকল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আমরা দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে কারিগরি শিক্ষা দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। বিদেশি শ্রমবাজারে যুবসমাজের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য দেশে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেভাবেই সব কাজ করা হবে।’
দীর্ঘ কয়েক বছর অতিবাহিত হলেও প্রকল্পটির উন্নয়নকাজ খুবই হতাশাজনক। জুলাই পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১০৬ কোটি টাকা বা আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে দশমিক ৫২ শতাংশ। এত ধীরগতির কারণে বাধ্য হয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ তা ভালোভাবে দেখভাল করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে (আইএমইডি) ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনাবিষয়ক প্রস্তুতিমূলক সভা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্প পরিচালকদের কাছে ধীরগতির কারণ জানতে চাওয়া হয় এবং আইএমইডি কর্মকর্তাদের দেখতে বলা হয়। দীর্ঘ সময়ে ১ শতাংশ অগ্রগতি না হলেও গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে এটা কখনোই সম্ভব না বলে জানিয়েছেন আইএমইডি সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল কর্মক্ষম যুবকদের দেশ-বিদেশে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাকরি বাজারের চাহিদার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকার লক্ষ্যে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং ৪টি ট্রেড ও স্বল্পমেয়াদি প্যারাট্রেড কোর্স চালু করতে দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৩২৯টি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন করা হবে। প্রকল্পের প্রধান কাজ হিসেবে ধরা হয় প্রতিটি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপনের জন্য ৩ একর বা ৯ বিঘা করে জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন। আরও রয়েছে, অ্যাকাডেমিকসহ প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, শিক্ষক ডরমিটরি, ২০০ শয্যার ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণ ও ওয়ার্কশপ বিল্ডিং নির্মাণ। এ ছাড়া সীমানাপ্রাচীর ও গেট নির্মাণ, আসবাবপত্র সংগ্রহসহ অন্য কাজও রয়েছে। উপজেলা সদরের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে এইসব প্রতিষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত হয়, যাতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীরা সহজে যোগাযোগ করতে পারেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন ও সংশোধনের গাইডলাইনে উল্লেখ করা আছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে প্রকল্পটি প্রণয়নে সঠিকভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হবে। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি। তবে আন্তমন্ত্রণালয় পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করে প্রকল্পটি প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়।
অতিরিক্ত সচিব পিযুষ কান্তি নাথ, অতিরিক্ত সচিব ড. সৈয়দ মাসুম আহমেদ চৌধুরী, যুগ্ম সচিব জিয়াউদ্দিন মামুন ও অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মশিউর রহমান প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সঠিকভাবে অগ্রসর হয়নি প্রকল্পটি। পঞ্চম প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে গত নভেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন যুগ্ম সচিব মো. শাখাওয়াত হোসেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বর্তমান পিডি খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রকল্পটির সঙ্গে এর আগে চারজন প্রকল্প পরিচালক জড়িত ছিলেন। কেন দেরি হয়েছে তারা বলতে পারবেন। তবে আমি দায়িত্ব নিয়ে চেষ্টা করছি যাতে গতি বাড়ে। দেরি হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব। ডিপিপিতে অনুমোদনের তুলনায় ভূমির দাম বেশি রয়েছে। এটার কারণে বেশ কিছু উপজেলায় প্রশাসনিক অনুমোদনও বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সমন্বয় করতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে। এ জন্য প্রকল্পের কাজে দেরি হচ্ছে। তবে খুলনার দিঘলিয়া, বাগেরহাটের মোল্লারহাটসহ পাঁচটি উপজেলায় অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। অন্য কাজও প্রক্রিয়াধীন।’
আইএমইডি সচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘১৩টি প্রকল্পের ধীরগতি জানার জন্য প্রকল্প পরিচালকদের সঙ্গে সভা করে কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। তারা বক্তব্য জানিয়েছেন। তা জানার পর আমি অফিসারদের দেখতে বলেছি। তারা প্রতিবেদন দিলে উপদেষ্টাকে অবহিত করা হবে এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হবে।’