পাল্টা শুল্ক নিয়ে দর-কষাকষির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি বিমান কেনার আশ্বাস দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের সেই আশ্বাস বিশ্বাস করতে পারছে না ট্রাম্প সরকার। এ জন্য শুল্কহার কমানোর আগেই ২৫টি বোয়িং কেনার চুক্তি করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডেন লিঞ্চের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরে এ প্রস্তাবটিই দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, রপ্তানি পণ্যে শুল্কহার কমানোর আগে ২৫টি বোয়িং কেনার চুক্তি দেখতে চায় ট্রাম্প সরকার। এ ব্যাপারে সম্মতিও জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে বোয়িং কেনার চুক্তির আগে এ বিষয়ে আরও আলোচনা করতে চায় বাংলাদেশ। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সফররত বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিনিধিদলের প্রধান ব্রেন্ডেন লিঞ্চের কাছে কিছু প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, চুক্তিতে স্বাক্ষর করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির একটি প্রতিনিধিদল যেন বাংলাদেশ সফরে আসে। বাংলাদেশের এই প্রস্তাবে ব্রেন্ডেন লিঞ্চ জানিয়েছেন, সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে তিনি দ্রুতই বোয়িং কোম্পানির একটি প্রতিনিধিদলকে ঢাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নেবেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে খবরের কাগজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং কোম্পানির বিমান কেনার ব্যাপারে বাংলাদেশ যে আশ্বাস দিয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের আরও আলোচনার দরকার আছে। বাংলাদেশের জন্য অভ্যন্তরীণ না কি আন্তর্জাতিক রুটের মানসম্পন্ন বোয়িং বিমান লাভজনক হবে, তা আমরা জানি না। আবার মধ্যম রেঞ্জের বোয়িং বিমানও লাগতে পারে। এ জন্য সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডেন লিঞ্চের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, বোয়িং কোম্পানির একটি প্রতিনিধিদল যেন ঢাকা সফরে আসে। তখন বাংলাদেশের উপযোগী মানের উড়োজাহাজ নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলও এ প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে এবং তারা বোয়িংয়ের আঞ্চলিক কার্যালয় ভারত থেকে ঢাকায় শিগগির একটি প্রতিনিধিদল পাঠাবে।
এরপর আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির বিষয়ে এগোবে বাংলাদেশ। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বিমানের বহর বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এই পরিকল্পনা সরকারের আগে থেকেই ছিল। তবে আগে ১৪টি বোয়িং কেনার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু ট্রাম্প সরকারের পাল্টা শুল্ক ইস্যুতে সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ২৫ করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বোয়িংয়ের ব্যবসা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নয়। এটি সে দেশের প্রাইভেট বোয়িং কোম্পানির। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে দর-কষাকষিতে বোয়িং কেনার চুক্তি আগে করতে চেয়েছে দেশটি। এ ছাড়া রপ্তানি পণ্যে শুল্কহার আরও কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রায় সব শর্তই মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য তুলা, গম, সয়াবিন ও জ্বালানি আমদানির বিষয়টিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই শর্তে আমদানিও বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন তেল আমদানি করতে মেঘনা গ্রুপের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেছে সে দেশের একটি কোম্পানি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি ও গম আমদানির বিষয়েও সমঝোতা চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য তুলাসহ অন্য কাঁচামাল কেনার ব্যাপারেও সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের এসব শর্তের কিছুটা ইতোমধ্যে মেনে নেওয়া হয়েছে এবং বাকি শর্তগুলো নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। সূত্র জানায়, বাংলাদেশ আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্র শুল্কহার কমিয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে নোমিয়ে আনবে, সেটা ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশও হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডেন লিঞ্চের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তিন দিনের সফরে গত রবিবার ঢাকায় আসে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করতেই তারা ঢাকায় আসেন। সফরকালে দলটি শুল্কহার নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলটি।
এর আগে গত ৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য পাল্টা শুল্কের হার ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ কার্যকর করে। তবে দেশটির সঙ্গে এ নিয়ে এখনো কোনো চুক্তি হয়নি। পাল্টা শুল্ক অন্তত ১৫ শতাংশে নামিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি করতে চায় ঢাকা। এ কারণে আলোচনার জন্য সময় চেয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে সাড়া দিয়ে ঢাকা সফরে আসেন ব্রেন্ডেন লিঞ্চের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি।