‘অথচ এই কথা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বিএনপির মহাসচিব) বললে বট বাহিনী এতক্ষণে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলত।’ গত বৃহস্পতিবার এক ফেসবুক পোস্টে এ কথা লিখেছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর ফারুক (শাকিল চৌধুরী)।
কেবল এই তরুণ ছাত্রনেতা নন, বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের কথায়ও এই ‘বট বাহিনী’ নিয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত অভিজ্ঞতার চিত্র সামনে আসছে। নাস্তানাবুদ হচ্ছেন অনেক রাজনীতিক। রাজনীতির মাঠে ক্রমেই দাপট বাড়ানো এই বট বাহিনী জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ও প্রকট হয়ে উঠবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তবে এই বট বাহিনী শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে ধারণা আছে খুব কম মানুষেরই।
ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর তানভীর হাসান জোহা তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। দৈনিক খবরের কাগজকে তিনি বলেন, “ইংরেজি রোবট (Robot) শব্দের শেষাংশ থেকে এই বট শব্দটি এসেছে। রোবট যেমন সয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে, এই ‘বট’ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। এতে প্রোগ্রাম সেট করে যদি কমান্ড দিয়ে দেওয়া হয়, বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কমেন্টের ঘরে গিয়ে ওমুককে গালি দিতে (বা নির্দিষ্ট করে অন্য কিছু বলতে), সে তাই করবে।
আবার যদি বলা হয়, অমুক অমুক ফেসবুক পোস্টে গিয়ে ‘লাইক’ দিতে, সে তাই করবে। হাজার হাজার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এ ধরনের পোস্ট, লাইক, ডিসলাইক (হাসির ইমো) বা কমেন্ট দেওয়া যায়। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ এই বটের প্রভাবে একজন প্রার্থীর পক্ষে বাস্তবতার বাইরে গিয়ে অস্বাভাবিক ইতিবাচক বা নেতিবাচক আবহ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা দেখে সাধারণ ভোটাররা প্রভাবিত হতে পারেন।”
জোহা বলেন, ‘একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সাধারণত একজন মানুষের হয়, এটি মানুষ পরিচালনা করে। তবে বটের অ্যাকাউন্টগুলো কোনো মানুষ পরিচালনা করে না। সেট করে দেওয়া প্রোগ্রাম/কমান্ড অনুসারে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে।’
বট বাহিনী সম্পর্কিত আরেক প্রশ্নের জবাবে শাকিল চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফেসবুককে পুঁজি করে ফেসবুকেই নানা পোস্টের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড। এতটুকু পর্যন্ত সবকিছুই খুব স্বাভাবিক, বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। কিন্তু অবাক করা কিছু অতিরঞ্জিত বিষয়ও সামনে চলে আসে। বিশেষ ইস্যুকে পুঁজি করে বট বাহিনী রাজনীতিকে নিজের দিকে নিয়ে আসতে চান। অনেকেই তাদের নাম দিয়েছেন বট বাহিনী।’ শাকিল চৌধুরী বলেন, ‘এই বাহিনীর কাজই হলো ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অন্য দলগুলো নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো।’
এর পাশাপাশি আবার নিজ দলের হয়ে দলীয় বিষয়গুলো বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দ্রুত ভাইরাল করার কৌশলেও বেশ পটু এই বট বাহিনী। দ্রুত লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারে রীতিমতো প্রশংসার ফুলঝুরিতে রূপান্তর করতে পারে যেকোনো নেগেটিভ পোস্টকেও। বিশেষ এই গোষ্ঠীর বট বাহিনী অপপ্রচার চালায় তাদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে কমেন্ট বক্সে ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্য দলগুলোর পোস্টে বাজে বাজে সব কমেন্ট করে।’
শুধু ছাত্রদল নয়, বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা প্রায়ই এই ‘বট বাহিনী’ নিয়ে কথা বলেছেন। কেবল বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম মাওলা রনিকেও এই শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে থেকে তিনি আওয়ামী লীগের সমালোচনায় সরব। তার বক্তব্যে রাজনীতিতে বট বাহিনীর দাপট আঁচ করা যায়।
এরই মধ্যে গত এপ্রিলের শুরুর দিকে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহসম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের বট বাহিনী যে ভাষায় আমাকে আক্রমণ করত, এই এনসিপি কিংবা তাদের তথাকথিত জেন-জির বাহিনী বট দিয়ে ঠিক একই ভাষায় আমাকে আক্রমণ করছে। যেভাবে শেখ হাসিনা সব দায় বিএনপির ওপর চাপাত, ঠিক একইভাবে ওরাও দেখছি সব দায় কোনো না কোনোভাবে অন্যের ঘাড়ে দিয়ে পার পেতে চাইছে।
গত ২৭ আগস্ট বিএনপির আরেক অঙ্গসংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এস এম জিলানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক বক্তব্যে বলেন, ‘বট বাহিনীর চেয়ে একটি জায়গায় আমরা পিছিয়ে আছি। বট বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক অ্যাক্টিভ, তারা ফেক আইডি খুলে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। এর বিপরীতে আমাদের সচেতন থেকে এসব গুজব ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়সম্মত তথ্য তুলে ধরতে হবে। বিএনপির বিভিন্ন পজিটিভ সংবাদ লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করতে হবে। সবাই মিলে সক্রিয় হলে মিথ্যাচার পরাজিত হবে।’
গত ১৪ আগস্ট ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক বলেছেন, আল বদর বাহিনী ধর্মের নামে ধর্মকে বিক্রি করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন। বট বাহিনীর লোকজন সকালে এক কথা বলে, বিকেলে আরেক কথা বলে। যাদের দিন শুরু হয় মিথ্যাচার দিয়ে, তারা দেশের জনগণের খেদমত করবে কীভাবে? তিনি আরও বলেন, আবার নতুন আরও একটি দল আসছে, তারা চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের উদ্ধত আচরণ, দাম্ভিকতা, চাঁদাবাজি ও দখলদারি কার্যকলাপের কারণে জনগণই তাদের জবাব দেবে।