রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির ঘটনা এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা। চোর চক্রের প্রথম লক্ষ্য থাকে নতুন নির্মিত লোহার ঢাকনা। লাগাতার চুরি বাড়ায় সড়কের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। এর ভুক্তভোগী একদিকে যেমন পথচারী, অন্যদিকে যানবাহন ও চালকরাও। গল্পের এখানেই শেষ নয়! ঢাকনাহীন ম্যানহোলের উপচেপড়া নর্দমার পানিতে জলাবদ্ধতা হচ্ছে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, বাড়ছে মশা। দীর্ঘ উপেক্ষিত সমস্যাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই কোনো হেলদোল।
২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে এ প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। দুই সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার মোট ঢাকনার ১০ শতাংশই গায়েব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা শিথিল হওয়ার পর থেকে চুরি এখন নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
রাজধানীতে টানা বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন সড়কে পানি জমে তৈরি হচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা। বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকা সড়ক বা ফুটপাতে কোথায় যে ম্যানহোলের ঢাকনা নেই তা সহজে বোঝা যায় না। এতে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে পথচারীদের। ম্যানহোলে একবার পড়লে পানির স্রোতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও থাকে। সম্প্রতি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ রকম একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
রাজধানীর কাকরাইল, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিবাগ, রামপুরা, সেগুনবাগিচাসহ বিভিন্ন সড়কে অসংখ্য ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল দেখা গেছে। স্থানীয়রা অনেক সময় বাঁশ বা কাঠের টুকরা দাঁড় করিয়ে চলাচলকারীদের জন্য সতর্কতা চিহ্ন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
শিশুদের জন্য এই বিপদ আরও ভয়াবহ। গত পাঁচ বছরে খোলা ম্যানহোলে পড়ে প্রাণ গেছে অন্তত ৩০ জনের। এর মধ্যে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মারা গেছেন ১২ জন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুও রয়েছে।
২০২২ সালে ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির উপ-রাষ্ট্রদূত জা জেনোস্কি রাজধানীর গুলশানে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে পড়ে আহত হন। ওই বছরের ২১ নভেম্বর হুইলচেয়ারে বসা নিজের জখমি পায়ের ছবি দিয়ে টুইট করেন তিনি। বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমালোচিত হয়। তখন সারা দেশে খোলা ম্যানহোল নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। সাধারণ মানুষ তাদের আঙিনার ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর আগেও ম্যানহোলে পড়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ২০১৭ সালে দেশব্যাপী তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তখন হাইকোর্ট ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন। সে সময় দুই সিটি করপোরেশন কাউন্সিলরদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হলেও সেই উদ্যোগ কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
আর কত মৃত্যু হলে টনক নড়বে
গত জুলাই মাসে টঙ্গীতে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে পড়ে মারা যান ফারিয়া তাসনিম জ্যোতি (৩২)। জ্যোতির বড় ভাইয়ের ছেলে আশিকুজ্জামান নিশাত তখন বলেছিলেন, ‘ফুপুর নিষ্পাপ দুই শিশুকে দেখে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তাদের কী বলে সান্ত্বনা দেব। মানুষের জীবনের মূল্য নেই।’ এই ঘটনায় দেশের মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোলা ম্যানহোলের ছবি পোস্ট করে ক্ষোভ জানালেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। নগরবাসী বলছেন, ‘চলতি বছর খবরের কাগজে মৃত্যু, দুর্ঘটনার খবর আসছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো শুধু দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন- প্রাণ কি এতই সস্তা?’
সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিতে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলের ভেতর পড়ে পা ভেঙে যায় মোহাম্মদপুরের শিক্ষক আজমন উল্ল্যাহর। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের কিছু হলে কার কী আসে যায়! অবহেলায় কত প্রাণ ঝরছে, তাও কেউ দেখার নেই।
রাজধানীর ম্যানহোল ও স্যুয়ারেজ লাইনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা এবং উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দুর্ঘটনা ঘটলে কোনো প্রতিষ্ঠানই দায়িত্ব নিতে চায় না। একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তারা। ঢাকা ওয়াসার নিয়ন্ত্রণে থাকা ম্যানহোলের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দেড় হাজারের বেশি গভীর ও অগভীর ড্রেন রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ম্যানহোল। ঢাকা ওয়াসার গভীর ড্রেনের দৈর্ঘ্য ৩৪৬ কিলোমিটার, আর উত্তর সিটির ড্রেনের দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৬শ কিলোমিটার। এসব ড্রেনের ওপরে তৈরি ম্যানহোলগুলোর অন্তত ১০ শতাংশ বর্তমানে ঢাকনাবিহীন রয়েছে। নতুন নির্মিত লোহার ঢাকনাই সবচেয়ে বেশি চুরি হচ্ছে। কারণ এগুলো বিক্রি করলে দাম বেশি পাওয়া যায়। শুধু চুরি নয়, অনেক সময় নির্মাণকাজে দায়সারাভাবে তৈরি হয় ম্যানহোলের ঢাকনা। ওয়াসা বা সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কংক্রিটের ঢাকনা নির্মাণ করলেও তা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। সেখানে তৈরি হয় বড় গর্ত। এই গর্ত মেরামত করতে আবার নতুন বাজেটের দরকার পড়ে।
চুরি হওয়া ঢাকনা ফেরি বা ভাঙারির দোকানে সহজেই বিক্রি হয়ে যায়। স্থানীয় ফেরিওয়ালা, রিকশা-অটোরিকশাচালক, মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাং, এমনকি কিছু পরিচ্ছন্নকর্মীও এই চোর চক্রের সঙ্গে জড়িত। চুরির সময় হিসেবে তারা বেছে নেয় গভীর রাতকে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ডেমরার মাহমুদনগর আবাসিক এলাকায় নতুন সংস্কার করা সড়কের ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক অটোরিকশাচালক ১৮ বার চেষ্টা করে লক ভেঙে ঢাকনা নিয়ে অটোরিকশাতে করে চলে যান। এমন ঘটনা এখন সাধারণ বিষয় হয়ে গেছে।
ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, মীর হাজীরবাগ, শ্যামপুর, সেগুনবাগিচা, গুলিস্তানসহ নানা এলাকায় অসংখ্য ঢাকনা উধাও। খোলা ম্যানহোলে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ছে অটোরিকশা ও রিকশা। বৃষ্টির সময় তা হয় দ্বিগুণ। কলাবাগান বসিরউদ্দিন রোড মসজিদের পাশে ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। মোহাম্মদপুর বিহারীক্যাপের আশপাশে অসংখ্য স্থানে ম্যানহোলের ঢাকনা উধাও। মীর হাজীরবাগ মাদ্রাসা রোডের চারটি ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। শ্যামপুরের ঘুণ্টিঘর মোড়ের ম্যানহোলের মুখও দীর্ঘদিন ধরে খোলা। ম্যানহোলের ঢাকনা নেই সেগুনবাগিচার বেশ কয়েকটি গলিতেও। এর মধ্যে জিটিভির গলির শুরুতেই খোলা পড়ে আছে একটি ম্যানহোল। একইভাবে জিটিভির পেছনের গলিতেও ঢাকনাবিহীন ম্যানাহোল রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পশ্চিম পাশের গলিতেও দীর্ঘদিন ধরে ঢাকনাবিহীন রয়েছে একটি ম্যানহোলের মুখ। এ ছাড়া সেগুনবাগিচায় কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পশ্চিম পাশের গলির ম্যানহোলেরও ঢাকনা উধাও। শুধু তাই নয়, গুলিস্তানের মতো ব্যস্ততম এলাকায়ও অনেক ম্যানহোলের ঢাকনা গায়েব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকনা নির্মাণে টেকসই কংক্রিট ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা দরকার। ঢাকনাগুলো এমনভাবে বসাতে হবে যাতে সহজে খোলা বা চুরি করা না যায়। পাশাপাশি ভাঙারি ব্যবসায়ীদের ওপর কঠোর নজরদারি চালাতে হবে যাতে তারা এসব চুরি করা ঢাকনা কিনতে না পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল, সিসিটিভি নজরদারি এবং স্থানীয়দের সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ সমস্যা কমানো সম্ভব। সবচেয়ে বড় বিষয়, ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনকে দায় এড়ানো বন্ধ করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
কর্তৃপক্ষ হতাশ, বিকল্প ভাবনা
ম্যানহোলের লোহার ঢাকনা চুরির বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, প্রতিদিনই ঢাকনা চুরি হচ্ছে। সব জায়গায় ঠেকানো সম্ভব নয়। সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। লোহার ঢাকনার বিকল্প হিসেবে বিদেশ থেকে কিছু আনার পরিকল্পনা রয়েছে। যাচাই-বাছাই চলছে। ফাইবার জাতীয় কিছু আমাদের ভাবনায় রয়েছে।
চুরি ঠেকাতে নতুন পরিকল্পনার কথা জানান দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ম্যানহোলের লোহার তৈরি ঢাকনাগুলোর ওজন ১২০-১৪৫ কেজি পর্যন্ত। ফলে চোররা ৫০ টাকা কেজি দামে বিক্রি করলেও অনেক টাকা পায়। তাই যত শক্ত লকই দেওয়া হোক না কেন, চোররা নতুন কৌশল বের করে ফেলে। তাই আমরা উদ্যোগ নিয়েছি প্লাস্টিক ফাইবারের ঢাকনা ব্যবহারের, যা চোর বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে না। কোনো কাজেও আসবে না। আগামী সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু হবে। লোহার বদলে ফাইবারের ঢাকনা ব্যবহার করা হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, নগরীতে ম্যানহোলের ঢাকনা উন্মুক্ত থাকায় শিশু-বৃদ্ধসহ অনেকেই মারা গেছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এই ইস্যুকে গুরুত্ব দেয়নি। তিনি বলেন যারা ঢাকনা চুরি করে এবং যেখানে বিক্রি করে, সেই স্পটগুলো চিহ্নিত করে রাখা দরকার। আবার লোহার বদলে বিকল্প কিছু চিন্তা করা প্রয়োজন যাতে চুরি কম হয়। সিটি করপোরেশনসহ অন্য সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক এবং প্রতিটি অলিগলির বাড়িওয়ালাদের সংযুক্ত করে সচেতন করতে হবে।