নদীটির উৎস সীমান্তের ওপারের সুউচ্চ পাহাড়। সবুজ পাহাড় বর্ষায় নীলাকার ধারণ করে। বড় বড় পাথরখণ্ড থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ধারা বা পাথর কাটা জলপ্রবাহ নদীটির প্রাণ। স্বচ্ছ নীল জলের নীরব ও নিরবধি প্রবাহে তৈরি জলপ্রকৃতিই ‘জলের জাদু’। সেই জাদুতে দৃশ্যমান থাকত হরেক জলজ সম্পদ। এর মধ্যে একটি ছিল বিরল প্রজাতির মাছ মহাশোল। বিরল মাছের বিনাশ হওয়ায় এখন জায়গা করে নিয়েছে বালু। সরকারিভাবে ঘোষিত বালুমহালে চাপা পড়েছে যাদুকাটা নদীর ‘জলের জাদু’।
নদীর নাম যাদুকাটা। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া পাহাড় থেকে এর উৎপত্তি। উৎসমুখ সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বারেক টিলা ও লাউড়েরগড় এলাকা। এরপর বিভিন্ন নদনদী ও হাওরের সঙ্গে মিশেছে। এ নদীটির কথা বৌলাই নামে এসেছে প্রাচীন গ্রন্থে। ‘শ্রীহট্টের ইতিহাস’ (১৯০৩) গ্রন্থে নদনদী অনুচ্ছেদে যাদুকাটা নদীটির নাম পাওয়া যায়নি। এ নদীর সংযোগ একটি নদীর নাম রয়েছে। গ্রন্থটির প্রথম অধ্যায়ের ‘সাধারণ বিবরণ’ অংশে নদনদীর বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘শ্রীহট্টের প্রধান নদীগুলো বরাক নদী হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। এই বরাক নদী মণিপুরের উত্তরে অঙ্গামী পর্বত হইতে বহির্গত হইয়া ভাঙ্গার নিকট কুশিয়ারা ও সুরমা নামক দুটি শাখাতে বিভক্ত হইয়াছে। ...বৌলাই নদী খাসিয়া পাহাড় হইতে নির্গত হইয়া ময়মনসিংহে ধনু নামে প্রবশে করিয়াছে।...’
যাদুকাটা প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য আর গড়প্রস্থ ৫৭ মিটার (১৮৭ ফুট)। বালুমহাল ঘোষিত হওয়ার কয়েক বছর ধরে পার কাটতে কাটতে এখন এই নদীটির গড় প্রস্থ এক কিলোমিটারের বেশি। এ অবস্থায় সম্প্রতি ফের ইজারা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। বালুমহালে নদীটির ভবিষ্যৎ রূপ সাগরে গড়ানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সাল থেকেই নদীর পাড় কাটা শুরু হয়। শুরুতে রাতের বেলায় লুকিয়ে পাড় কাটা হতো। কিন্তু ২০২১ সালে বালুমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়ার পর দিন-রাত চলে কাটার কাজ। ২০২১ সালে যাদুকাটা নদীতে বালুমহাল তৈরি করে প্রথমে দুটি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো এক বছরের জন্য ৬৮ কোটি ৬৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় নদীর দুটি বালুমহাল ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। যাদুকাটা-১ বালুমহাল ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় সোহাগ এন্টারপ্রাইজ এবং যাদুকাটা-২ বালুমহাল ৪২ কোটি ৯০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় আরাফ ট্রেড করপোরেশন লিমিটেড ইজারা নেয়।
জানা গেছে, বালুমহাল দুটি আলাদা হলেও ইজারাদাররা একীভূত হয়ে বালু আহরণ করেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতায় ইজারাদারি প্রভাব মিইয়ে গেলেও সম্প্রতি এক ইজারাদারের আবির্ভাব ঘটেছে। তাতে ইজারা মেয়াদের সর্বশেষ ছয় মাসের জন্য যাদুকাটার বালু আহরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জলজীবিকায় শ্রম অনুসন্ধানী শ্রমিক রাজনীতিবিদ সাইফুল আলম ছদরুল বলেন, নদীটির নামের সঙ্গে ‘কাটা’ শব্দটি থাকায় ধারণা করা হচ্ছে এখানকার শ্রমজীবিকা বহু পুরোনো। কাটলেই আহরণ হয় বালু অথবা পাথর। তবে এমন জীবিকায় যখন যন্ত্রের ব্যবহার দানবীয় রূপ ধারণ করে, তখন থেকে বিড়ম্বনা তৈরি হয়।
তিনি তার দেখা থেকে জানিয়েছেন, নদীর পাড়ের মানুষের কর্মসংস্থানের জায়গা ছিল ‘যাদুকাটা’। হাতে অর্থাৎ ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে বালু তুললে এখানে তাদের বহু বছর কর্মসংস্থান হতো। এই নদীটি একসময়ে প্রস্থে ছিল ৫৭ মিটার, এখন তাকালে মনে হবে সাগর। এই অবস্থার পেছনে একটি লুণ্টনকারী চক্র রয়েছে। তারা দিন দিন নদীতে লুটপাট বাড়িয়েছে। কিন্তু কোনো শাস্তি হচ্ছে না। এ কারণে নদীর তীর ভাঙছে। মানুষের ঘরবাড়ি, সড়ক বিলীন হচ্ছে। এদের চিহ্নিত করতে হবে। যারা মূল হোতা তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। যাতে এলাকার পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং নদীকে রক্ষা করা যায়।
হাওর রিসার্চ সেন্টারের (এইচআরসি) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সজল কান্তি সরকার জানান, মূলত মহাশোল মাছের জন্য নদীটি বিখ্যাত। তবে নদীর নামকরণে ‘কাটা’ শব্দটি পুরোনো ইতিহাস সন্ধানে নতুন কোনো তথ্য বহন করে। এই মাহাত্ম্য এখনো অনুদঘাটিত। নদীটি সমতলে তাহিরপুর উপজেলার বারেক টিলা ও লাউড়েরগড় এলাকার মধ্য দিয়ে পাঁচ কিলোমিটার গিয়ে দক্ষিণে ফাজিলপুর এলাকায় তেমোহনায় এবং পরে দক্ষিণে রক্তি ও পশ্চিমে বৌলাই নামে প্রবাহিত হয়েছে। আবহমানকাল ধরে খাসিয়া পাহাড় থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে বয়ে আনত বালু-পাথর। কিন্তু এখন বালু-পাথরই নদী ও নদী-তীরবর্তী বাসিন্দাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে ফেলছেন বালু-পাথর ব্যবসায়ীদের কাছে। ভাঙনে গ্রাম-মৈত্রী সেতু (নির্মিতব্য), শিমুলবাগান বালুময় হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
ঝুঁকি কাটিয়ে নদী রক্ষার বিষয়টি তালাশ করতে গিয়ে পাওয়া গেছে একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ। ওই এলাকার একাধিকবারের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত নজির হোসেন জাতীয় রাজস্ব আদায়ের উদ্ভাবনী চিন্তা থেকে যাদুকাটার উৎসমুখটি জলবন্দর হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করেছিলেন। জলবন্দর স্থাপন বিষয়টিও সুপ্রাচীন। ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক বিন্যাসের সূচনাকালে বেঙ্গল অ্যাটলাসের তথ্যে যাদুকাটা এলাকা আফিম চোরাচালানের জলপথ ছিল। সেই পথ বন্ধ করতে তখনকার কলকাতার ‘সায়রদ্বীপ’ আদলে জলবন্দর প্রতিষ্ঠার পন্থা অনুসরণীয় ছিল সাবেক সংসদ সদস্যের প্রস্তাবে।
এমন প্রস্তাব বাস্তবায়নের মধ্যে নদীর সুরক্ষা বিষয়টি নিয়ে আলাদা করে ভাবনার তাগাদা দিয়েছেন সিলেট অঞ্চলে নদী আন্দোলনের একজন সংগঠক, সারি বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবদুল হাই আল হাদী। তিনি বলেন, ‘যাদুকাটা নদীর সঙ্গে জলের জাদুর সন্ধান সম্ভবত এভাবেই প্রোথিত হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পনাতীর্থ ও মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য শাহ আরেফিনের বার্ষিক ওরস ঘিরে যাদুকাটা নামটি ছড়িয়ে আছে দেশজুড়ে। নামের মাহাত্ম্য বলুন, আর কুণ্ড সন্ধান করুন, নদীটি রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নজর দিতে হবে।’