পুলিশি সেবা সহজ করার অংশ হিসেবে সারা দেশে সব থানায় চালু করা হয়েছে অনলাইনে জিডির (সাধারণ ডায়েরি) ব্যবস্থা। এর মূল উদ্দেশ্য- নাগরিকরা যাতে ঘরে বসেই জিডি করতে পারেন। অনলাইন জিডির সেই কার্যক্রম চালু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রয়ে গেছে জটিলতা। এখনো অন্তত ৯০ শতাংশ ভুক্তভোগীর জিডি লেখা থেকে শুরু করে সব কাজ করে দিতে হচ্ছে থানা পুলিশকেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিডি অ্যাপ ব্যবহারে অনাগ্রহ ও অজ্ঞতাসহ নানা কারণে এখনো ঘরে বসে সবাই জিডির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন না। অধিকাংশ ভুক্তভোগী সরাসরি থানায় গিয়েই ডিউটি অফিসারকে দিয়ে কম্পিউটারে বসিয়ে অনলাইন জিডি সম্পন্ন করছেন। এর বাইরে সার্ভার ব্যবস্থাপনার ক্রটি বা দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকার কয়েকটি থানা ঘুরে ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ সদস্যরা জানান, পুলিশ অনলাইনে জিডি ও ক্লিয়ারেন্সসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা দিচ্ছে। কিন্তু সার্ভারের জটিলতা বা দুর্বলতার কারণে অনেক সময় নাগরিকরা এই অনলাইন সেবার সম্পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের ৬৩৯টি থানায় একযোগে এই সেবাটি চালু রয়েছে। কিন্তু অনলাইন জিডি অ্যাপ সঠিকভাবে ব্যবহার না করতে পারা, প্রায় সময় ‘সার্ভার ডাউন’ থাকা বা সার্ভার-জটিলতার কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সেবাপ্রত্যাশীরা। এতে বেগ পেতে হচ্ছে থানার দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদেরও।
গত সোমবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় একটি মোবাইল ফোন হারানোসংক্রান্ত বিষয়ে জিডি করতে গিয়েছিলেন এক যুবক। সেখানে দেখা যায়, ডিউটি অফিসারের দায়িত্বে থাকা একজন নারী উপ-পরিদর্শক (এসআই) কম্পিউটারে বসে ওই যুবকের জিডির বিষয়বস্তু লেখা থেকে শুরু করে সার্বিক কাজটি করছিলেন। কিন্তু সব কাজ করার পর দেখা দেয় ‘সার্ভার ডাউনের’ বিপত্তি।
পরে আলাপকালে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ওই যুবক বলেন, ‘থানায় ঢুকে ডিউটি অফিসারের সামনে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এর পরই আমার কাজটি শুরু করেন ডিউটি অফিসার। উনাদের (পুলিশ সদস্য) সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলেও অনলাইন জিডির সার্ভার পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক সময় অপেক্ষার পর সার্ভার এলে পরে জিডির একটি প্রিন্ট কপি পান তিনি।’
মিরপুর থানার একাধিক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘সেবাপ্রত্যাশীরা অনলাইন জিডি অ্যাপের মাধ্যমে জিডি না করে এখনো সরাসরি থানায় চলে আসছেন। থানার ডিউটি অফিসারকে এখনো জিডি করে দিতে পুরোপুরি সহায়তা করতে হয়। সাধারণ মানুষের জন্য অনলাইন জিডি করার নিয়ম বা প্রক্রিয়া এবং সঠিক ভাষা ব্যবহারে দুর্বলতা রয়েছে। এই বিষয়ে যথেষ্ট প্রচার ও সচেতনতা প্রয়োজন।’
গত ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে ভাটারা থানায় দুর্ঘটনাসংক্রান্ত একটি ডিজি করতে যান ভুক্তভোগী মো. হাবীবুল্লাহ খান। তিনি জানান, সার্ভার নেই বলে অপেক্ষা করছি। ডিউটি অফিসারও আমার কাজ নিয়েই বসে আছেন। সার্ভার এলে তারপর জিডি কপি প্রিন্ট হাতে পাব। সাধারণত বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সার্ভারে বেশি জটিলতা দেখা দেয় বলে জানান একাধিক থানার পুলিশ সদস্যরা।
গত ২ অক্টোবর উত্তরা পশ্চিম থানায় গিয়ে দেখা যায়, থানা ভবনের নিচে বসানো হয়েছে ‘হেল্প ডেস্ক’। সেখানে দুজন পুলিশ সদস্য দুটি কম্পিউটার নিয়ে একটি লম্বা টেবিলে বসে ছিলেন। সামনে ছিলেন একজন সেবাপ্রত্যাশী। ওই সময় ভুক্তভোগী ব্যক্তি ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলেন এবং দায়িত্বরত পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক মেহেদী হাসান জিডি লিপিবদ্ধ করছিলেন। কিন্তু সব লেখা শেষ করার পর দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয় সার্ভার ডাউন বা জটিলতার কারণে।
ওই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) পর্যায়ের একাধিক পুলিশ সদস্য খবরের কাগজকে বলেন, সার্ভার না পেলে অপেক্ষায় বসে থাকা ছাড়া আমাদের কিছুই করার থাকে না। এতে সেবাপ্রত্যাশীদেরও বিড়ম্বনা বা ভোগান্তি বাড়ে। সেবাপ্রত্যাশীরা বেশির ভাগই অনলাইন জিডি অ্যাপ ব্যবহারে পারদর্শী নন। আর এ কারণেই অনলাইন জিডি অ্যাপ সেবার মূল উদ্দেশ্যটি সেভাবে সফল হচ্ছে না। এখনো প্রায় ৯০ শতাংশ ভুক্তভোগীর অনলাইন জিডি পুলিশ সদস্যদের করে দিতে হচ্ছে। বাকিরা অনলাইন জিডি অ্যাপের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হচ্ছেন।
অধিকাংশ পুলিশ সদস্য জানান, অনলাইন জিডি সেবা চালুর কারণে নাগরিক সেবা দেওয়ার হার বেড়েছে। থানায় সরাসরি গিয়ে জিডি বা সাধারণ ডায়েরি করার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমছে। এতে থানায় অন্য প্রয়োজনীয় কাজের গতিও বেড়েছে। জিডি লিপিবদ্ধ হওয়ার পর সেটি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সহজেই মনিটরিং করতে পারছেন। জিডি তদন্তে পরবর্তী অগ্রগতি কী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জবাবদিহির জায়গাটি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু সার্ভার জটিলতা এখনো সবাইকে ভোগাচ্ছে। এ ছাড়া জিডি অ্যাপের সঠিক ব্যবহার করতেও পারছেন না অনেকে। এগুলো করা গেলে থানা পুলিশের সেবা বা কাজের গতি আরও অনেকাংশে বেড়ে যাবে বলে মনে করেন মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, সব থানায় অনলাইন জিডি চালু হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের এতে অভ্যস্ত হতে একটু সময় লাগবে। ধীরে ধীরে সবাই অনলাইন জিডি অ্যাপের ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন ও দক্ষ হবেন। কারিগরি বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত উন্নত করা হচ্ছে। কারিগরি ত্রুটি পেলে তা দ্রুত সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এখন যারা প্রযুক্তির বিষয়ে অভ্যস্ত তারা অ্যাপ ব্যবহার করছেন। অনলাইন জিডি চালুর কারণে এখন পুলিশি সেবা ও সুবিধা অনেকটা সহজ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে অনলাইন জিডির সেবা প্রথম চালু হয়েছিল ২০১০ সালের প্রথম দিকে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই এই সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে সেবাটি পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে সেটি সব থানায় চালু হয়েছিল। কিন্তু গত বছরের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বহুসংখ্যক থানা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনলাইন জিডির প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। অবশ্য এরই মধ্যে দেশের সব থানায় অনলাইন জিডির সেবাটি আবার চালু হয়েছে।