কংক্রিটের রাজধানীতে একসময় পার্কগুলো ছিল স্বস্তি ও প্রশান্তির ঠিকানা। শিশুদের খেলাধুলা, বৃদ্ধদের হাঁটা, পাখিদের কিচিরমিচিরের মেলবন্ধন দেখা যেত। কিন্তু আজ সেসব পার্ক দখল, দূষণ ও অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে। পার্কগুলো কাগজে-কলমে যত বড় দেখানো হচ্ছে বাস্তবে তত বড় নয়। উল্টো দিন দিন এসবের পরিধি কমতে শুরু করেছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, তদারকির ঘাটতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে অধিকাংশ পার্কই পরিত্যক্ত, জরাজীর্ণ ও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, দখল ও অপরিচ্ছন্নতায় শুধু মানুষ নয়, শহরের ছোট প্রাণী, পাখি, মৌমাছি ও প্রজাপতির জীবনেও তৈরি হয়েছে মারাত্মক সংকট। ঢাকার সবুজ পরিবেশ এখন সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তথ্যমতে, তাদের আওতায় রয়েছে ২৩টি পার্ক, ৪টি শিশুপার্ক ও ৮টি খেলার মাঠ। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে রয়েছে ২০টি পার্ক ও ১৯টি খেলার মাঠ। এগুলোর বেশির ভাগই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বা পড়ছে। এসব পার্কে প্রায়ই নোংরা পানি ও ময়লার স্তূপ চোখে পড়ে। উন্নয়নের নামে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে পার্কগুলো। ব্যবহারের অনপেযোগী পার্কে কিশোর গ্যাং, মাদকসেবী ও অপরাধীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হচ্ছে। রাত যত গভীর হয় তত বাড়তে থাকে অনৈতিক কার্যকলাপ।
কারওয়ানবাজার-পান্থপথ, বাংলামোটর, কাঁঠালবাগান অঞ্চলের মাঝের এলাকায় পান্থকুঞ্জ পার্ক। ২০১৮ সালে পার্কটিকে আধুনিকায়নের নামে টিন দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করে পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা। তবে অজানা কারণে প্রায় ৮ বছর ধরে পার্কটি বন্ধ রয়েছে। পরিবর্তনের নামে পার্কে চলছে বুলডোজার। গাছ কেটে ফেলায় তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। পথচারীদের মল-মূত্র ও নোংরা পানি জমে থাকার কারণে সৃষ্টি হয়েছে দুর্গন্ধ। দীর্ঘদিন জনসাধারণের ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় অপরাধীদের জন্য আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে ‘পান্থকুঞ্জ’ পার্কটি। সব সময় চলে মাদক সেবন। সন্ধ্যার পর থেকে চলে অনৈতিক কাজ। এমনকি মানুষের বসতি ও রিকশা পার্কিং- গ্যারেজও গড়ে উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্প শুরু হয় কিন্তু যথাযথ তদারকি না থাকায় কাজ থমকে যায়। বাস্তবে যা হওয়া উচিত ছিল তার থেকেও খারাপ রূপ নিয়েছে পার্কটি।
রাজধানীর ফুসফুস বলে পরিচিত ওসমানী উদ্যান আজ কার্যত আক্রান্ত। সচিবালয়, গুলিস্তান ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাঝখানে অবস্থিত এই উদ্যানটি ২০১৮ সাল থেকে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ। উন্নয়নকাজের ধীরগতিতে যেমন নাগরিক সুবিধা হারিয়েছেন সাধারণ মানুষ, তেমনি সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন অপরাধ চক্র। দীর্ঘদিন ধরে টিনের আড়ালে উদ্যানটি এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল পরিণত হয়েছে। রাতে মাদকসেবীদের আড্ডা, কিশোর গ্যাংয়ের আনাগোনা, এমনকি দেহব্যবসার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। উদ্যানের ভেতর ‘জুলাই ছাত্র আন্দোলনে’ নিহতদের স্মরণে
নির্মিত হচ্ছে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। এ জন্য কাটা পড়েছে অনেক গাছ।
ধানমন্ডির শিশুপার্কও বেহাল হয়ে পড়েছে। পার্কের সামনে গাবতলীর প্রধান সড়ক ও পিছনে ধানমন্ডি লেক থাকায় এটি বহু মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাও। তবে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত থাকার ফলে পার্কটি এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। পার্কের ঠিক গা-ঘেঁষে বড় ময়লার ভাগাড় তৈরি করেছে সিটি করপোরেশন। ধানমন্ডি এলাকার সব ময়লা সেখানে স্তূপ করা হচ্ছে। এসব আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধে পুরো এলাকা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মশা-মাছির প্রকোপও বেড়ে গেছে, ফলে পার্কে বেড়াতে আসা মানুষ ও পথচারীরা নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এদিকে পার্কের পিছন ঘেঁষে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে প্রায়ই তরুণদের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়। এতে পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। এলাকাবাসী ও পার্কে ঘুরতে যাওয়া মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত পার্কটির পরিবেশের সার্বিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেবে।
জিয়া উদ্যানে বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত আলো নেই। রাত নামলেই উদ্যানটি অন্ধকারে ঢেকে যায়, ফলে সেখানে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক, শ্যামলী পার্ক, ইকবাল রোড পার্ক ও হুমায়ুন রোড পার্কের পরিবেশ অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্যের কারণে নষ্ট হচ্ছে, যা নিয়মিত যাতায়াতকারীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্কের এই অবনতি ধীরে ধীরে শহর ধ্বংসের সূচনা। যেখানে আগে বিভিন্ন জাতের পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছিসহ নানা প্রাণীর দেখা পাওয়া যেত সেখানে এখন তাদের অস্তিত্ব ক্রমশ কমছে। সবুজের হ্রাস মানেই বায়ুদূষণের হার বাড়া। আর এতে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিবেশবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যদি দ্রুত সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্তকরণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে শহরের জনজীবন ও পরিবেশগত ভারসাম্য দুই-ই বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, উন্নয়নের নামে, চেতনার নামে পার্ক ও উদ্যান ধ্বংস করা হচ্ছে। নগরীর আকারের তুলনায় ২৫% বনভূমি থাকার কথা। সেখানে আমাদের উত্তর সিটিতে আছে ১০.৫% আর দক্ষিণ সিটিতে ১০.৮%। যা থাকার কথা তার অর্ধেকও নেই। যা আছে তাও সংরক্ষণ না করে ধ্বংস করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পার্কে বিভিন্ন ধরনের পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যেত, যা আনন্দদায়ক পরিবেশ তৈরি করত। কিন্তু এখন আর পাখির ডাক শোনা যায় না। এতে বোঝা যাচ্ছে আমাদের পরিবেশ কোন দিকে যাচ্ছে। উদ্যান ধ্বংস না করার আইন থাকলেও কর্মকর্তারা তা মানেন না। বরং অবাধে অবিরামভাবে ঢাকার ফুসফুস ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। আর এ সবই হচ্ছে প্রকল্প বাড়িয়ে টাকা খাওয়ার ধান্দা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খবরের কাগজকে বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে আমাদের
পার্কগুলো ধ্বংসের মুখে। উদ্যান প্রকল্পের ডিজাইন কখনোই জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা হয় না। রাষ্ট্রের আগ্রহ থাকার প্রয়োজন, যা অনুপস্থিত।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় যেখানে সবুজ এলাকা অত্যন্ত কম, সেখানে একটি উদ্যানের উন্নয়ন ডিজাইন করতে আট–দশ বছর লাগানো কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মনে হয়েছিল পরিবর্তন আসবে, কিন্তু বিস্ময়করভাবে তা হয়নি।
পার্কের বিষয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেছেন, আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও জনসাধারণের সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, অনেক ঠিকাদার পরিবর্তন হয়েছে। তাই পার্কগুলো ব্যবহারের উপযুক্ত করতে সময় লাগছে। দ্রুত সমাধান হবে। সেভাবে কাজ চলছে।