নভেম্বরে এসেও ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমছে না, বরং অক্টোবরের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এদিকে রাজধানীতে কিছুটা শীত অনুভব হচ্ছে। সেই সঙ্গে কিউলেক্স মশার উৎপাতও বেড়েছে। মশার যন্ত্রণায় বিকেলের পর রাস্তাঘাটে দাঁড়ানোই মুশকিল। ঘরে-বাইরে মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ মানুষ। সিটি করপোরেশনের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ নগরবাসী। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে মশার ওষুধ কিনে বাসাবাড়িতে ও আশপাশে স্প্রে করছেন। তবে সিটি করপোরেশন বলছে, তারা নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, মশা নিধনের সমন্বিত কার্যক্রম যথাযথভাবে না হওয়ায় সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ কাজে আসছে না। আগামী মাস থেকে এডিস মশার উৎপাত কমলেও বাড়বে কিউলেক্স মশার।
রাজধানীর পূর্ব জুরাইন এলাকার বাসিন্দা সবুজ বলেন, ‘বাসার নিচে বিকেলের পর দাঁড়ানো যায় না। এক মিনিট দাঁড়ালেই মশা কামড় দিয়ে অতিষ্ঠ করে তোলে।’
আজিমপুরের বাসিন্দা রিফাত বলেন, ‘আমি দোতলায় থাকি। ঘরে এত পরিমাণ মশা, সন্ধ্যার পর মশারি ছাড়া থাকাই যায় না। বুঝি না কী করছে সিটি করপোরেশন। পত্রিকায় দেখি মশা নিধনের কার্যক্রম। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই দেখি না।’
রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের কোনো উদ্যোগ আমাদের এলাকায় দেখিনি। তাই বাধ্য হয়ে নিজেরা কীটনাশক কিনে তা স্প্রে করেছি। সিটি করপোরেশন কাজ করছে শুধু কাগজে। বাস্তবে করছে বলে মনে হয় না। কেনই বা করবে। তারা তো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা থাকে। এখন যারা চালাচ্ছেন, তাদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে বলে মনে হয় না।’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ঢাকার দুই সিটি চলছে প্রশাসক দিয়ে। নেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।
রাজধানীর বাংলামোটর এলাকার গেভি গলির ফুটপাতে এক চায়ের দোকানে বসে গত বুধবার বিকেলে চা খাচ্ছিলেন দুই ব্যক্তি। বিকেল তখন পৌনে ৫টা। চা খাচ্ছেন আর হাত-পা না নাড়াচাড়া করছেন। একজন হাত দিয়ে পায়ে পড়া মশা লক্ষ্য করে বারবার থাপ্পড় মারছেন। একবার পায়ে একবার হাতে, আবার কখনো মুখে, কাঁধে।
তাদের একজন চায়ের দোকানদারকে বলছিলেন, ‘আপনাদের কাছে মশার কয়েল নেই? আপনারা কয়েল জ্বালান না? এখানে তো মশার যন্ত্রণায় বসা যাচ্ছে না। এখনো সন্ধ্যা হয়নি, তাতে এই অবস্থা। সন্ধ্যার পর কী অবস্থা হয়। না আপনার এখানে বসা যাবে না।’ একজন আরেকজনকে বলেন, ‘চলো এখান থেকে চলে যাই।’ চা শেষ না করে মশার যন্ত্রণায় তারা উঠে চলে যান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রবিবারও ডেঙ্গুতে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এই মাসের ২৩ তারিখ পর্যন্ত ৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে মৃত্যু হয়েছে ৩৬৪ জনের।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরে দিনে গড়ে ৫২৮ জনের বেশি, অক্টোবরে ৭২৬ জন করে এবং নভেম্বরে দিনে গড়ে প্রায় ৮৮৭ জন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অক্টোবরে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নভেম্বরের ২৩ দিনে মৃত্যু হয়েছে ৮৬ জনের। এই মাসের বাকি আছে আরও সাত দিন।
চলতি বছরের এই পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ২৬৪ জন। জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৬১, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪, মার্চে ৩৩৬, এপ্রিলে ৭০১, মে মাসে ১ হাজার ৭৭৩, জুনে ৫ হাজার ৯৫১, জুলাইয়ে ১০ হাজার ৬৮৪, আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬ এবং সেপ্টেম্বরে ১৫ হাজার ৮৬৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, যা আগস্টের চেয়ে ৫ হাজার ৩৭০ জন বেশি। অক্টোবরে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৫২০ জন, যা সেপ্টেম্বরের চেয়ে ৬ হাজার ৬৫৪ জন বেশি। ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৪০২ জন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১০, ফেব্রুয়ারিতে ৩, এপ্রিলে ৭, মে মাসে ৩, জুনে ১৯, জুলাইয়ে ৪১, আগস্টে ৩৯ ও সেপ্টেম্বরে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা আগস্টের প্রায় দ্বিগুণ। অক্টোরের মৃত্যু হয়েছে ৮০ জনের।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ বিষয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এখনো মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। কারণ কী? কারণ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যেসব উদ্যোগ দরকার, তা ঠিকমতো নেওয়া হচ্ছে না। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ হলে নিয়ন্ত্রণে থাকত। এখনো প্রচুর পরিমাণে এডিস মশা আছে। তবে আগামী মাস থেকে কমতে শুরু করবে। বাংলাদেশে ১২৬ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়। শীতকালে কিউলেক্স মশা বেড়ে যায়। এখন কিউলেক্স মশা বাড়ছে। আর কয়েকটা দিন গেলে আরও বাড়বে। তখন বাইরে দাঁড়ানো আরও মুশকিল হয়ে যাবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (অতি. দা.) ডা. নিশাত পারভীন বলেন, ‘মশা নিধনের কার্যক্রম খুব ভালোভাবে চলছে। কিউলেক্স মশা যে বেড়েছে, আশা করা যায় তা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।’ তবে এ বিষয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও সম্ভব হয়নি।