আসন্ন নির্বাচন ঘিরে দেশব্যাপী নাশকতা বেড়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে নাশকতা ঘটাতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিদেশ থেকেও অর্থ সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেল ও হুন্ডি–দুই উপায়েই নাশকতায় অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে। আসন্ন নির্বাচন ঘিরে নাশকতায় অর্থ সরবরাহ বন্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। গঠন করা হয়েছে বিশেষ টাস্কফোর্স। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নেতৃত্বে এ কমিটি পরিচালিত হবে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে এসব জানা যায়।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এই টাস্কফোর্স কমিটিতে অর্থ, বাণিজ্য, স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা আছেন। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতিনিধিদেরও রাখা হয়েছে। কমিটি থেকে কোনো গরমিল পাওয়া গেলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে সুপারিশ করবে। এরপর প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন হলে টাস্কফোর্স কমিটি এ বিষয়ে যাবতীয় তথ্য জরুরিভাবে খতিয়ে দেখবে। বিশেষভাবে ব্যাংক হিসাবধারীর আয়-ব্যয়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খোঁজ নেওয়া হবে। ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া অর্থ কোন কাজে ব্যবহার করা হবে, তারও বিস্তারিত খোঁজ নেবে টাস্কফোর্স কমিটি। অন্যদিকে অস্বাভাবিক লেনেদেন যে ব্যাংক হিসাবে হয়েছে তা কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে হলে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক কে বা কারা আছেন তার তথ্য জোগাড় করা হবে।
প্রতিবেদনে আছে, অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে এমন ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে অন্য যেসব ব্যাংক হিসাবের বেশি লেনদেন হয়েছে তার তথ্যও জোগাড় করা হবে। অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে এমন ব্যাংক হিসাবধারীর পরিবারের সদস্যদেরও আয়-ব্যয় ও সম্পদের তথ্য খতিয়ে দেখা হবে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ব্যাংক হিসাবে কে বা কারা অর্থ জমা দিয়েছেন, জমা হওয়া অর্থ কোন উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে তা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হবে। বিদেশ থেকে অর্থ জমা হলে জমাদানকারী সম্পর্কে তথ্য জোগাড়ে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা নেওয়া হবে। টাস্কফোর্স কমিটি যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাইয়ের কাজে প্রয়োজনে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেবে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যে বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন ঘিরে অসাধু ব্যক্তিরা যেন কোনো ধরনের অপতৎপরতা, নাশকতা চালাতে না পারে সে জন্য সরকার সতর্ক আছে। নির্বাচন ঘিরে নাশকতা ঠেকাতে সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। আশা করি, এতে নাশকতা বন্ধ হবে। একটি সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে।’
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রপ্তানি করা পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দেখানো হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট বন্দরে জমা দেওয়া কাগজপত্রে। শুধু তা-ই নয়, রপ্তানি করা পণ্যের দাম ও পরিমাণ নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বড় অঙ্কের প্রণোদনাও নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পণ্য রপ্তানি করে যে দাম পাওয়ার কথা, নাশকতায় অর্থ ব্যবহারকারীরা তার থেকে অনেক বেশি ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনছেন। এ অপকর্ম বন্ধ করতে ব্যবসায়ী নেতাদের সহায়তা চাওয়া হবে।
এ বিষয়ে দেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাধারণত জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করেন। এদের যতটা না রাজনৈতিক পরিচয় আছে, তার চেয়ে বড় পরিচয় এরা সন্ত্রাসী। এরা সব সময় নিজের লাভ দেখেন। এরা ব্যবসায়ী নামধারী হলেও প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ী নন। ব্যবসায়ী নামধারী কারও ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন ধরা পড়লে অবশ্যই তদন্ত করে দেখতে হবে। এর দায় প্রকৃত ব্যবসায়ীদের নয়। আমরা প্রকৃত ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কাজে জড়িত রপ্তানিকারকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে। তারা সরাসরি রাজনীতি করেন বা রাজনৈতিক দলের অর্থের জোগানদাতা ব্যক্তি। তৈরি পোশাক খাতসহ দেশের বড় মাপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এ অপকর্ম করা হচ্ছে। বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না।
এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে দেখা গেছে, বেশির ভাগ সময়ে অর্থ সরবরাহকারী ব্যক্তি শুধু নিজেই নাশকতা ঘটাচ্ছেন, তা নয়। অর্থ সরবরাহ করে অন্যকে দিয়ে নাশকতা করাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অনেক নেতা ও দলটির সমর্থক অনেকে আত্মগোপনে আছেন। তাদের অনেকে নাশকতায় অর্থ সরবরাহ করছেন বলে গোয়েন্দা তথ্য আছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, প্রতি নির্বাচনের আগে কালো অর্থের লেনদেন হয়। কালো অর্থ ব্যবহার করে সহিংসতা হয়। এরই মধ্যে দেশের অনেক স্থানে নাশকতা সংঘটিত হয়েছে। সরকারকে নাশকতায় অর্থ সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এতে নাশকতাও বন্ধ হবে।