বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করতে সম্মত হয়েছে ট্রাম্প সরকার। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ও ঢাকার একাধিক সূত্র এ বিষয়টি খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ, ভারত, চীনসহ বিশ্বের ৬০ দেশের রপ্তানি পণ্যে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নিয়ে এসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য-যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে এবং শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে আনার লক্ষ্যে দর-কষাকষি করে। তখন বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে দেশটি। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দর-কষাকষিতে শুল্ক ২০ শতাংশে নেমে আসে। এই শুল্ক আরও কমানোর প্রস্তাব করে বাংলাদেশ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু শর্ত মানার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশকে।
ওয়াশিংটন সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমানোর বিষয়ে যেসব শর্ত দিয়েছে, ঢাকা ইতোমধ্যে তার অধিকাংশই মেনে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক সমন্বয় করতে গিয়ে বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ২৫টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সম্প্রতি বোয়িং কেনার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ওয়ার্ক অর্ডারও দিয়েছে বাংলাদেশ।
এদিকে ইউরোপের কাছ থেকে এয়ারবাস না কিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং কেনায় নাখোশ হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কেননা ইউরোপীয় কোম্পানি এয়ারবাসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আগে থেকেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কোনো কারণে এই এয়ারবাস কেনা না হলে তা বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে সাফ জানিয়ে দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ। এ নিয়ে গত নভেম্বরে ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা একটি বৈঠকও করেন। সেখানে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে, জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে ১৪টি প্লেন বিক্রির প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে ইইউ, যার মধ্যে রয়েছে ১০টি এয়ারবাস এ-৩৫০ এবং চারটি এয়ারবাস এ-৩২০নিও।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক কমানোর দর-কষাকষিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিষ্পত্তির শর্ত দেয় দেশটি। তা হলো–দুই দেশের মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্য যেসব পণ্য রপ্তানি করে, তারচেয়ে ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বেশি আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। দর-কষাকষিতে এই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রতিও দেয় বাংলাদেশ সরকার। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম ও সয়াবিন আমদানি করা হয়েছে এবং আরও পণ্যের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গম, সয়াবিন ও সুতা আমদানির লক্ষ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। এতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে আসায় বাংলাদেশের ওপর শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে আনার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে ট্রাম্প সরকার, যা অতি শিগগির চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে যাচ্ছে দেশটি।
সূত্র আরও জানায়, শুল্ক কমানোর দর-কষাকষিতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও একটি পণ্যের ওপর শুল্ক বাংলাদেশের কাছে কমানোর প্রস্তাব দেয় দেশটি। তা হলো–সে দেশের মদ আমদানির ওপর সর্বোচ্চ শুল্ক কমিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জানায়, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মদ আমদানির বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মদ আমদানিতে শুল্ক না কমিয়ে অন্য দেশ থেকে আমদানি করা মদের শুল্ক বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ। এ ছাড়া দর-কষাকষিতে জানানো হয়, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারকাজ করছে। এটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য-বিনিয়োগসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বাড়াবে বাংলাদেশ। এসব বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট হয়ে শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী মঙ্গলবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে কিংবা আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমানোর ঘোষণা আসতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কমুক্ত নীতির অনেক উপাদান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের ওপর শুল্কবাধা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে আন্তরিকতা দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিদ্যমান ২০ শতাংশ শুল্ক ঠিক কতটা কমানো হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানান তিনি। তবে দ্রুতই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলে জানান তিনি।
গত বছরের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশসহ বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। তখন বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়, যা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ৯ এপ্রিল। কার্যকরের দিন তিন মাসের জন্য দেশভিত্তিক বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা স্থগিত করা হয়। তিন মাসের এ শুল্ক বিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে গত ৯ জুলাই বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের জন্য নতুন করে শুল্কহার পুনর্নির্ধারণ করেন ট্রাম্প। তখন বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২ শতাংশ কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। ১ আগস্ট থেকে এই হার কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনায় ১ আগস্ট বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা ওই দিন থেকেই কার্যকর হয়।