ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদ শুরু হবে সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন থেকে। সাধারণ নির্বাচনের ফল প্রকাশ হয়েছে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি। সংবিধানে ৭২(২) অনুসারে গেজেটের মাধ্যমে নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ আহ্বান করবেন রাষ্ট্রপতি। ফলে আগামী ১৪ মার্চের মধ্যে যেকোনো দিন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে।
এদিকে নিবার্চনের ফল প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর কথা। সংসদ সদস্যদের শপথের ক্ষেত্রে সংবিধান-নির্ধারিত ব্যক্তি হলেন স্পিকার। কিন্তু স্পিকার অনেক আগেই পদত্যাগ করেছেন। ডেপুটি স্পিকার রয়েছেন কারাগারে। যদিও সংবিধান অনুসারে স্পিকার পদত্যাগ করলেও পরবর্তী স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য তাদের পাওয়া না গেলে সংবিধানে দুটি বিকল্প আছে। প্রথম বিকল্প হলো- ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২-এর ‘ক’ উপ-দফা অনুযায়ী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অসমর্থ হওয়ার তিন দিন পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাবেন। দ্বিতীয় বিকল্প হলো– ৭৪ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-দফা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কার্যাবলি পালনের জন্য একজনকে নিযুক্ত করতে পারেন। যদিও এই বিধান সংসদ চালু থাকা অবস্থায় কার্যকর হয়ে থাকে। আরও পরিষ্কারভাবে বললে, ৭৪ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-দফা মূলত সংসদ কার্যকর থাকা অবস্থায় স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদের অধিবেশন পরিচালনার পদ্ধতিসংক্রান্ত। যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করা হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আগামী ১৬ বা ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সংবিধান অনুসারে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের জন্য তিন দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই তিন দিন পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতে পারেন।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে— ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যেকোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’
এবারের সংসদ হবে অতীতের চেয়ে আলাদা-
সংসদের প্রথম ১৮০ দিন হবে একত্রে দ্বৈত চরিত্রের। একটি আগের মতো সংসদ হিসেবে কাজ করবে, অপরটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে পরিষদের বিলুপ্তি ঘটবে। তবে এর পরেই সংসদকে দেখা যাবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। একটি হলো নিম্নকক্ষ, যাকে আমরা জাতীয় সংসদ হিসেবে দেখে আসছি। আরেকটি উচ্চকক্ষ, যা অতিরিক্ত ১০০ সদস্য নিয়ে গঠিত হবে।
১৮০ দিন শেষে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। অর্থাৎ, নির্বাচনে যারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের নিয়ে হবে সংসদের নিম্নকক্ষ। নির্বাচিত ৩০০ জনের সঙ্গে সংবিধান অনুসারে সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য যুক্ত হবেন ৫০ জন। এরপর সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যার মেয়াদ থাকবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। উচ্চকক্ষে মোট সদস্য হবেন ১০০ জন। সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই আনুপাতিক হারে (পিআর পদ্ধতি) সদস্য মনোনীত হবেন। অর্থাৎ কোনো দল যদি ৪০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে তারা ৪০টি আসন পাবে। আবার কেউ ১ শতাংশ ভোট পেলে তাদের ১ জন প্রতিনিধি থাকবে উচ্চকক্ষে।
বিদ্যমান সংসদ মূলত আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ সভা। রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন পাস হয়ে থাকে সংসদ থেকেই। সেই আইন সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে যায় অনুমোদনের জন্য। এই সংসদ নিম্নকক্ষ হিসেবে আগামীতেও একইভাবে আইন পাস করবে। তবে এটি সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে না গিয়ে উচ্চকক্ষেও ভোটাভুটির মাধ্যমে পাস হলে, তবেই রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। অবশ্য উচ্চকক্ষ আইনটি নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠালে পরের বার সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ এবং নিম্নকক্ষ সংসদের ক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার বা সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশের ভোট এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের প্রয়োজন হবে।
এদিকে আগামীকাল বা পরশু সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হলে পরবর্তী ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতি এই মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথ পড়াবেন বলে জানা গেছে।