আপাতত ফাইলবন্দি থাকছে জাতীয় জুলাই সনদ। বিশেষ করে সনদে সংবিধানের বিষয়গুলো সমাধানে কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলেও জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদ সদস্যরা। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী দলটি জানিয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতায় শপথ গ্রহণে বিরত থাকতে হয়েছে। ফলে জুলাই সনদে সংবিধানসংক্রান্ত ৪৮টি বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এখন জুলাই সনদের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে জাতীয় সংসদের অধিবেশনগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত। সংবিধান অনুসারে আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সংবিধানের ৭২(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, জাতীয় নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে নতুন সংসদের অধিবেশন ডাকতেই হবে।
কিছু ক্ষেত্রে আপত্তি বা ভিন্নমতসহ (নোট অব ডিসেন্ট) রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া জুলাই সনদে সাংবিধানিক, প্রশাসনিক ও নির্বাচনি সংস্কারসহ নতুন রাষ্ট্রকাঠামো বিনির্মাণের রূপরেখা রয়েছে। এই রূপরেখায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে জাতীয় সংসদের প্রথম ১৮০ দিন একত্রে দ্বৈত চরিত্রের হওয়ার কথা ছিল। একটি আগের মতো সংসদ, অপরটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। এ জন্য সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। একটি হলো সংসদ সদস্য হিসেবে। অপরটি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি অর্থাৎ সদ্য গঠিত সরকারি দলের সদস্যরা গতকাল শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা সাফ জানিয়েছেন, যেহেতু তারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিজয়ী হননি এবং বিদ্যমান সংবিধানে এমন সদস্য পদের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই এ বিষয়ে তারা শপথ নেবেন না। ভবিষ্যতে বিষয়টি সংবিধানে যুক্ত হলে শপথ নেবেন কি না, তখন ভেবে দেখা হবে।
বিএনপির এ অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্যরা প্রথমে কোনো শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দুটি ক্ষেত্রেই (সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে) শপথ নেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণপরিষদ গঠনের পূর্ণতা না পাওয়ায় সাংবিধানিক প্রশ্নে আগামীতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সংসদে পূর্ণাঙ্গভাবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ আসনের অধিকারী বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া বিষয়গুলো বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় বিএনপি যা চাইবে তা-ই হবে। তবে দলটি জাতীয় সংসদে ভিন্নমতের যৌক্তিক বিষয়গুলো মেনে চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে জুলাই সনদ সহসাই বাস্তবায়ন হবে– এমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
এ অবস্থায় আগামীতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে কমিশনের আরেক সদস্য (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) খবরের কাগজকে জানান, বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসতে পারে।
গতকাল শপথ অনুষ্ঠানে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার কারণ জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা গণপরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। সংবিধানে এ বিষয়টি যুক্ত না থাকায় বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। গণভোটের রায় অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে। কে শপথ নেওয়াবেন সেটার বিধান করতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের ফরম সংবিধানে নেই। এ ফরম সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো জাতীয় সংসদে সাংবিধানিকভাবে গৃহীত হওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে। আমরা সাংবিধানিকভাবে এই পর্যন্ত এসেছি। আমরা সংবিধান মেনে সামনের দিনেও চলব।’
জুলাই সনদ অনুসারে জাতীয় সংসদের প্রথম ১৮০ দিনে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে পরিষদের বিলুপ্তি ঘটার কথা। এর পরেই সংসদ হওয়ার কথা দুই কক্ষবিশিষ্ট। একটি হলো নিম্ন কক্ষ, যাকে আমরা জাতীয় সংসদ হিসেবে দেখে আসছি। আরেকটি উচ্চ কক্ষ। সংসদের ১৮০ দিন শেষে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত ১০০ সদস্য নিয়ে উচ্চ কক্ষ গঠনের কথা। সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে ১০০ সদস্য নির্ধারণ অর্থাৎ নির্বাচনে বিভিন্ন দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই আনুপাতিকহারে উচ্চ কক্ষে সদস্য মনোনীত হবে। কিন্তু জুলাই সনদের এই অংশে বিএনপি ভিন্নমত দিয়ে বলেছে, নিম্ন কক্ষে আসনের আনুপাতিকহারে উচ্চ কক্ষেও আসন নির্ধারিত হবে।
জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধানসম্পর্কিত। অপর ৩৬টি প্রস্তাব সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ জারি বা আইনবিধি করে বাস্তবায়ন সম্ভব। এ ধরনের কিছু প্রস্তাব ইতোমধ্যে বাস্তবায়নও করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ বা কোনো আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। তাই ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব ঘিরে ৪টি পয়েন্টের একটি প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ এবং বিপক্ষে ‘না’ ভোটের সুযোগ রেখে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়। এর মধ্যে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে জুলাই সনদের যে বিষয়গুলো পাস হবে পরবর্তী সময়ে সেগুলো সংবিধানে যুক্ত হবে। সংবিধানে সংস্কার পরিষদের বিষয়টি যুক্ত হওয়ার পর এ বিষয়ে শপথ পাঠে রাজি হতে পারে বিএনপি। আবার সেই সময় জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা নতুন করে শপথ পড়বেন কি না, সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়।