চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চলতি বছরে গাড়ি আমদানি ও খালাস কমেছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। গত বছরের মার্চে রেকর্ড পরিমাণ গাড়ি খালাস হলেও চলতি বছরের মার্চে তা সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। বিশ্ব অর্থনীতির নেতিবাচক অবস্থা, জ্বালানিসংকট, ডলারের উচ্চমূল্য ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে এ খাতের ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন।
- চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চলতি বছরে গাড়ি আমদানি ও খালাস প্রায় ৪৪ শতাংশ কমেছে; প্রথম চার মাসে এসেছে মাত্র ২ হাজার ৯১২টি গাড়ি।
- ডলার সংকট, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, উচ্চ শুল্ক ও বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গাড়ির বাজারে বড় মন্দা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
- বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক গাড়ি ব্যবসায়ী লোকসানে পড়েছেন; এ কারণে শুল্ক কমানো ও আমদানিযোগ্য গাড়ির বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বারভিডা।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৬টি জাহাজে করে দেশে এসেছে মাত্র ২ হাজার ৯১২টি গাড়ি। অথচ গত বছর মাত্র তিন মাসেই আমদানি হয়েছিল প্রায় চার হাজার গাড়ি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫১৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৫৩টি, মার্চে ৪৯৭টি এবং এপ্রিল মাসে আমদানি হয় ৭৪৪টি গাড়ি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম খবরের কাগজকে বলেন, আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে শেডে গাড়ির সংখ্যা অনেক কম। ফলে এখানে এখন কোনো ধরনের গাড়ির জট নেই। বৈশ্বিক নানা সংকটের কারণে গাড়ি আমদানি কিছুটা কমেছে। ব্যবসায়ীরাও নানা সমস্যায় রয়েছেন। তাই ব্যবসা কম হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিসংখ্যান মতে, ২০২৫ সালে বন্দর দিয়ে ৩১টি জাহাজে মোট ১৪ হাজার ১৬৪টি গাড়ি আমদানি হয়েছিল। এর মধ্যে বছরের প্রথম তিন মাসে ৩ হাজার ৮৫৪টি গাড়ি ডেলিভারি দেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যে শুধু মার্চ মাসে রেকর্ড ১ হাজার ৯৫৯টি গাড়ি এসেছিল।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন খবরের কাগজকে বলেন, বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ ও জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে আমদানিকারকরা এখন কম গাড়ি আনছেন। তাই মার্চ ও এপ্রিলে গাড়ি আমদানি কমেছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে গাড়ি আমদানিতে ৮০০ থেকে সাড়ে ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট ও দাম বৃদ্ধি। ফলে গাড়ি কেনায় আগ্রহ কমে গেছে ব্যবসায়ীদের।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডার) সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হাবিবুর রহমান ডন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। ডলারসংকট, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা সুবিধাজনক না। এলসি, পেমেন্ট প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা ঝামেলায় পড়ছি। বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ কমে গেছে। তাই আমাদের বেচাকেনাও কমে গেছে। এখন ক্রেতারা গাড়ি কেনায় আগ্রহী নন। বিশেষ করে জ্বালানির অনিশ্চয়তার কারণে তেলের গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বিধায় আছেন। তাই ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারা।’
পরিসংখ্যান মতে, বাজেটের আগে গাড়ি আমদানি ও খালাসের চাপ থাকে বন্দরে। তবে এবার আমদানি কমে যাওয়ায় চাপ কমেছে খালাসেও। গত বছরের মার্চে বন্দর থেকে রেকর্ড ১ হাজার ৯৫৯টি গাড়ি খালাস করে আমদানিকারকরা। প্রথম তিন মাসে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৫৪। তবে চলতি বছরের মার্চে গাড়ি খালাস হয়েছে মাত্র ৪৯৭টি। এর আগে ২০২৪ সালে ২০ হাজারটি, ২০২৩ সালে ২৪ হাজার ১৫০টি গাড়ি আমদানি হয়েছে। ২০২২ সালে ৩০ হাজার ৮৮০টি গাড়ি আমদানি হয়। ২০২১ সালে ৫৫ হাজার ১৫১টি গাড়ি আমদানি হয়। ২০২০-এ আমদানি হয় ২৮ হাজার ৬৯৩টি গাড়ি। ২০১৯-এ আমদানি হয় ৬১ হাজার ৪৬৭টি গাড়ি।
এবার আসন্ন বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির আমদানিতে সময়সীমা বৃদ্ধি, শুল্ক কমানোসহ বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায় অটো টাস্ট নামে একটি শোরুমে গাড়ির ব্যবসা করতেন মোহাম্মদ আদিল। তিনি জানান, লোকসানের কারণে এ বছরের শুরু থেকে গাড়ি আমদানি বন্ধ রেখেছেন। আগের যে গাড়িগুলো রয়েছে সেগুলো বিক্রি করতে পারছেন না ক্রেতার অভাবে। কোটি কোটি টাকা পুঁজি খাটিয়েও বিক্রি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘গাড়ির ব্যবসা পরিবর্তন করে অন্য ব্যবসায় যাওয়ার চেষ্টা করছি। গাড়ি আমদানি করে আশানুরূপ লাভ করা যাচ্ছে না।’
নগরের মুরাদপুর এলাকায় গাড়ির ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গাড়ির দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাও নেই। একসময় বিদেশি গাড়ি, বিশেষ করে জাপানি গাড়ির বেশ চাহিদা ছিল। এখন সেটিও কমে গেছে। একসময় প্রতিদিন এক-দুটি গাড়ি বিক্রি হতো। এখন মাসে এক-দুটি বিক্রি হয়। সেটি দিয়ে কর্মচারীর বেতন-ভাতাও হয় না।
এদিকে আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে হাইব্রিড, প্লাগ ইন হাইব্রিড ও জাপানের রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়েছে বারভিডা। মাইক্রোবাসের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, পিকআপে শুল্ক কমানো, নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শুল্কায়ন বৈষম্য দূর করা এবং আমদানিযোগ্য গাড়ির বয়সসীমা ৫ বছর থেকে ৮ বছরে উন্নীত করার দাবি তুলেছে সংগঠনটি।
বারভিডার হিসাবমতে, রিকন্ডিশন্ড মোটরযান আমদানি ও বিপণন খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় বিনিয়োগ রয়েছে। সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব দেয়। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজসহ এ খাতকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৪ সালের পর বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কিছুটা কমলেও শুল্ক ও কর হার অপরিবর্তিত থাকার মধ্যে ‘টাকার অবমূল্যায়নের’ কারণে আমদানি করা গাড়ির দাম বেড়ে যায়। এতে গাড়ি অধিকাংশ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যায়, কমে যায় বিক্রি। এর ফলে ২০১৫ সালে ২১ হাজার ৯৫২টি, ২০১৬ সালে ২১ হাজার ২৯টি এবং ২০১৭ সালে ২০ হাজার ২৬৮টি গাড়ি বিআরটিএ নিবন্ধিত হয়। ২০২৩ সালে তা কমে ১০ হাজার ৭৮৪টিতে নামে। ২০২৪ সালে নিবন্ধন হয় ১০ হাজার ৪৯৯টি আর ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৯ হাজার ৩৮৭টিতে।