ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুতির একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন শাখায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কর্মকর্তাদের বেছে বেছে মারধর করে ডেস্কে বসতে বাধা দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলা হয়। এমনকি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হওয়া সাধারণ নাগরিকদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে।
- ইসলামী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক প্রভাবে তাদের অফিসে বাধা ও নির্যাতন করা হয়েছে।
- ভুক্তভোগীদের দাবি, থানায় গিয়েও তারা কোনো সহায়তা পাননি, বরং উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই জিডি করা হয়েছে।
- সামাজিক মাধ্যমে চাকরিচ্যুতদের পক্ষে কথা বলায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) শাখার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে ও ডেস্কে বসতে বাধা দেওয়া হয়। এই ঘটনার ভিডিও করতেও বাধা দেয় হামলাকারীরা। পরে আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে পুলিশও তাকে কোনো সহযোগিতা করেনি।
ওই ভুক্তভোগী জানান, হামলাকারীরা রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ায় পুলিশ তাকে সহযোগিতা করেনি।
চট্টগ্রামের বাসিন্দা ওই ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলাম জানান, ঘটনার পরদিন আত্মীয়স্বজনরা তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। পরে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটে যে, তারা আইনি প্রতিকার চাওয়ার সাহসও হারিয়ে ফেলেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর যখন আমরা অফিসে যাই, তখন আমাদের বাধা দেওয়া হয়। উপস্থিতির খাতায় আমাদের স্বাক্ষর করতে দেওয়া হয়নি, ডেস্কে বসতে বারণ করা হয়। অথচ এ বিষয়ে অফিসের কোনো সার্কুলার ছিল না।’
মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘সার্কুলার দেখাতে বলার কারণে ওই শাখার জিবি ইনচার্জ প্রিন্সিপাল অফিসার মো. মনিরুল ইসলাম আমাকে মারধর করতে এগিয়ে আসেন। সেই সময় উপস্থিত কয়েকজন বিবেকবান লোক এসে তার হাত থেকে আমাকে রক্ষা করেন। শাখার ব্যবস্থাপক হারুনুর রশিদ অফিসে আসার পরে আমাকে জোর করে ধরে তার চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। ম্যানেজার তখন আমাদের ডাইনিং রুমে বসিয়ে রাখেন।’
মফিজুল বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর শাখা ব্যবস্থাপক একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মীকে ফোন করে অফিসে নিয়ে আসেন। ব্যবস্থাপকের ইশারায় তারা আমার কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে সেখান থেকে বাইরে নিয়ে যান। তারা আমাকে মারধর করে রক্তাক্ত করে ফেলেন এবং জানে মেরে ফেলার হুমকি দেন। সিসি ক্যামেরা থাকার কারণে ব্যবস্থাপকের চেম্বারে মারার পর আমাকে ওয়াশরুমে নিয়েও মারধর করা হয়। পরে সেই সিসি টিভির ফুটেজ সরিয়ে নেওয়া হয়। শাখার জিবি ইনচার্জ, ইনভেস্টমেন্ট ইনচার্জসহ অন্যরা আমাকে মারার সময় ভিডিও করছিলেন, কিন্তু কেউ আমাকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসেননি। এমনকি অন্য কাউকে মোবাইল ফোনও বের করতে দেননি। জোর করে আমার মোবাইলও তারা কেড়ে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব ডিলিট করে দেন। রাত পর্যন্ত আমার মোবাইল তারা আটকে রাখেন। হামলাকারীরা আমার গলা থেকে ব্যাংকের আইডি কার্ডও জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে বাইরে ফেলে দেন। তারপর আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে চলে যেতে বলেন। অন্যথায় জানে মেরে ফেলার হুমকি দেন।’
আরও পড়ুন >> ইসলামী ব্যাংকে কর্মী ছাঁটাই: চট্টগ্রামেরই প্রায় ৮ হাজার
মফিজুল অভিযোগ করেন, ‘পরে আমি এ বিষয়ে থানায় গেলেও আইনগত সহযোগিতা পাইনি, বরং ওই শাখার অপারেশন ম্যানেজার মাহমুদুল হাসান থানায় গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে জিডি করেন।’
মো. মফিজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমি ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার হিসেবে ইসলামী ব্যাংকে জয়েন করি। আমি ব্যাংকটির কোম্পানীগঞ্জ শাখায় ৬ বছর ৮ মাস কাজ করেছি। এই সময়ের মধ্যে জুনিয়র অফিসার এবং অফিসার–এই দুটি পদে পদোন্নতি পেয়েছিলাম। এখন আমি সম্পূর্ণ বেকার। আর এক মাস পরে আমার ৩২ বছর শেষ হয়ে যাবে, তাই কোথাও আর নতুন চাকরি পাওয়ার সুযোগ নেই। আমি বিবাহিত, স্ত্রী জব করে না। সব মিলিয়ে খুব চাপে সময় কাটাচ্ছি।’
যা বলছেন কোম্পানীগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংক কোম্পানীগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক হারুনুর রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সেদিন শাখায় গ্রাহকদের সঙ্গে একটু ঝামেলা হয়েছিল। এখানে আমার কিছু করণীয় ছিল না। আমাদের সঙ্গে কিছুই হয় নাই। আমি গিয়েছি সমাধান করার জন্য। পরে আমরা পুলিশ ডেকেছি। যারা ঝামেলা করেছে তাদের পুলিশ বের করে দিয়েছে। আমরা থানায় কোনো জিডি করিনি।’
থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদ বলেন, ‘আমি এখন ওই থানার দায়িত্বে নেই। বদলি হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে ডিবি পুলিশে কর্মরত। আমি থাকার সময় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়ে আমার জানা নেই।’
আরেক ভুক্তভোগী ইসলামী ব্যাংকের প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা প্রকৌশলী হেফাজত উল্যাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ব্যাংকের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ব্যাংকের গাড়িচালক, ইলেকট্রিশিয়ান, পিয়নদের সঙ্গে নিয়ে তাকে মারধর করে বের করে দেন। কিল-ঘুষি মারতে মারতে ৫ তলা থেকে নামিয়ে দেন।’
তিনি বলেন, ‘আমার ওপর চরম পর্যায়ের অমানবিক আচরণ করেছে তারা। অথচ এসিআরে আমি সব সময় ফুলমার্ক পেয়েছি। সে সময় থানার পুলিশ অ্যাকটিভ ছিল না। তাই সেনাবাহিনীর কাছে বিচার দিতে গেলে তৎকালীন প্রকৌশল বিভাগের প্রধান ও বর্তমানে এইচআরডি প্রধান কাউসার আলম টেলিফোনে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি দেখছেন। শেষ পর্যন্ত তাকেই চাকরিচ্যুত করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যাংকের শ্রমিক-কর্মচারীদের সংগঠনের নেতারা মব সৃষ্টি করে কর্মকর্তাদের হেনস্তা করেছেন। তারা অনেকের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছেন। হুমকি দিয়ে অফিস ছাড়তে বাধ্য করেছেন।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইসলামী ব্যাংকের এইচআরডিপ্রধান কাউসার আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
ব্যাংকে চাকরি না করেও মামলার আসামি
মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন নামে একজন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি ইসলামী ব্যাংক কিংবা অন্য কোনো ব্যাংকে চাকরি করি না। শুধু চাকরিচ্যুতদের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি করেছি। নিপীড়তদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। এ কারণে আমার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর মতিঝিল থানায় মামলা করেছে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সাইবার সিকিউরিটি আইনে করা ওই মামলায় আমাকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। আরও চারজনকে আসামি করা হয়। তারা সবাই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের পক্ষে কথা বলেছি।’
মামলা হওয়ার আগে তিনি বিদেশ চলে যান। যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন তার নামে মামলা হয়েছে।
আরও পড়ুন::
>> ইসলামী ব্যাংকের পিয়ন-দারোয়ানরা এখন কর্মকর্তা
>> ইসলামী ব্যাংকে হঠাৎ ধস
>> ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত আন্দোলনকারীদের হুমকি জামায়াত নেতা দেলোয়ারের