কার্লো আনচেলত্তি ফুটবল ইতিহাসে কৌশল এবং সাফল্যের ধারক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকাদের মধ্যে অন্যতম। খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে তার ঘটনাবহুল ক্যারিয়ার বিশ্ব ফুটবলে এক চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। ইতালির রেজিওলো রে ১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া আনচেলত্তির ফুটবল যাত্রা শুরু হয় স্থানীয় ক্লাব পার্মার মাধ্যমে। মাঝমাঠে তার দুর্দান্ত খেলার দক্ষতা দ্রুতই নজরে আসে এবং ১৯৭৯ সালে তিনি রোমায় যোগ দেন।
রোমার হয়ে ১৯৮৩ সালে সিরি আ জয়ের পর, কোচ আরিগো সাক্কির অধীনে ১৯৮৯ ও ১৯৯০ সালে মিলানের হয়ে দুইবার ইউরোপিয়ান কাপ (বর্তমানে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) জেতেন। পরবর্তী কোচিং ক্যারিয়ারে আরিগো সাক্কির কৌশলগত প্রভাব আনচেলত্তির কোচিং স্টাইলে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়।
ইতালি জাতীয় দলের হয়ে ১৯৮১-১৯৯১ সাল পর্যন্ত ২৬টি ম্যাচে অংশ নেওয়া আনচেলত্তি দুর্দান্ত পারফরমেন্সের পাশাপাশি করেছিলেন ১ গোল। ১৯৮৮ ইউরো ও ঘরের মাঠে আয়োজিত ১৯৯০ বিশ্বকাপ স্কোয়াডের সদস্য ছিলেন তিনি, তবে চোটের কারণে খুব বেশি ম্যাচে তাকে পাওয়া যায়নি।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ১৯৯৫ সালে রেজজিয়ানা ক্লাবের মাধ্যমে আনচেলত্তির কোচিং যাত্রা শুরু হয় এবং পরের বছরই পার্মার কোচ হয়ে তিনি পরিচয় করিয়ে দেন তরুণ জিয়ানলুইজি বুফনের মতো প্রতিভাকে। এরপর ১৯৯৯ সালে ইতালির শীর্ষ পেশাদার ফুটবল লিগের ক্লাব জুভেন্টাসে যোগ দেন।
জুভেন্টাস ছেড়ে ২০০১ সালে এসি মিলানে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার কোচিং ক্যারিয়ারের সোনালি অধ্যায় শুরু করেন। ২০০৩ ও ২০০৭ সালে এসি মিলানকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতান এবং ২০০৪ সালে সিরি আ জিতিয়ে ক্লাবকে ইউরোপের অন্যতম সেরা দলে পরিণত করেন। সে সময় তার অধীনে পাওলো মালদিনি, আলেসান্দ্রো নেস্টা, কাফু, কাকা এবং জাবি আলোন্সোর মতো তারকারা ছিলেন। আনচেলত্তি তার কোচিং কৌশলে ভারসাম্য তৈরি করতে, আরিগো সাক্কির ৪-৪-২ এবং ৪-৩-২-১ ফরমেশনকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দিতে পছন্দ করেন। তার অধীনে থাকাকালীন সময় কাকা (২০০৭) ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন।
২০০৯ সালে মিলানের সফল অধ্যায়ের পর ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে চেলসি, প্যারিস সেন্ট জার্মেই, রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ, নাপোলি এবং এভারটনে আনচেলত্তি কোচিং করান। চেলসির হয়ে (২০০৯-২০১১) জেতেন প্রিমিয়ার লিগ ও এফএ কাপ। পিএসজির হয়ে জেতেন ফ্রেঞ্চ লিগ। কোচ হিসেবে তিনি বায়ার্নের ডাগ আউট সামলান এক মৌসুম এবং জেতেন বুন্দেসলিগা টাইটেল। তার সর্বোচ্চ সফলতা আসে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে। ২০১৪ সালে তার অধীনে রিয়াল মাদ্রিদ দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জেতে ‘লা ডেসিমা’ দশম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা।
২০২১ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো রিয়ালের দায়িত্বে আসেন এবং ২০২২ সালে জেতান আরও একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও লা লিগা শিরোপা। তার অধীনে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, কামাভিঙ্গা এবং রদ্রিগোরা নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়। আনচেলত্তির মধ্যে ‘মেন ম্যানেজমেন্ট’ দক্ষতা অনন্য। রোনালদো, কাকা, মালদিনি, টেরি, ক্রুস কিংবা বেনজেমা সব খেলোয়াড়দের মুখে তার প্রশংসা, ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্বের কথা উঠে এসেছে।
তিতের বিদায়ের পর ব্রাজিল একটি স্থায়ী নেতৃত্বের অভাবে ভুগছিল এবং অস্থায়ী কোচ হিসেবে ফার্নান্দো দিনিজ দায়িত্ব পালন করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। যার ফলপ্রসূতে ২০২৩ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জোরালো গুঞ্জন উঠেছিল কার্লো আনচেলত্তিকে সেলেসাওদের নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন (CBF) থেকেও এমন ইঙ্গিত মিলেছিল, তবে বাস্তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে নানান জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চতুর্থ ফরেন কোচ হিসেবে আজ থেকে ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল ৮৫তম প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন কার্লো আনচেলত্তি। এর আগে বিদেশি কোচ হিসেবে রামন প্লাতেরো (উরুগুয়ে)– ১৯২৫, জোরেকা (পর্তুগাল)– ১৯৪৪ এবং ফিলপো নুনেজ (আর্জেন্টিনা)– ১৯৬৫ সেলেসাওদের ডাগ আউট সামলেছেন।
কার্লো আনচেলত্তি শুধু ট্রফি জেতা কোচ নন, তিনি ব্যতিক্রমধর্মী ফুটবল চিন্তার অধিকারী। তাকে বলা হয় দ্য ট্যাক্টিশিয়ান ডন কার্লো এবং এই নামের পেছনে রয়েছে তার কৌশলে নমনীয়তা ও দুর্দান্ত পরিকল্পনার ক্ষমতা। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক কৌশল তৈরি এবং পরিবর্তন করার অসাধারণ ক্ষমতা, তাকে দিয়েছে ফুটবল বিশ্বের মাঝে এক অনন্য মর্যাদা। এখন সারা বিশ্ব দেখার অপেক্ষায়, ইউরোপীয় সাফল্যের এই রূপকার বিশ্বের সফল ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিলকে কীভাবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।