গবেষণা বলছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের অনেক ম্যাচ হতে পারে ভয়াবহ তাপদাহের মধ্যে। খেলোয়াড়দের ক্লান্তি, ধীর গতি আর রক্ষণাত্মক ফুটবল- সবকিছুর পেছনে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে গরম আবহাওয়া। অর্থাৎ এবারের বিশ্বকাপে শুধু মেসি-রোনালদো-এমবাপ্পে-হালান্ড নন, খেলবে সূর্যমামাও!
আগামী ১১ জুন পর্দা উঠবে ফিফা বিশ্বকাপের। চলবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আগামী বিশ্বকাপের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ম্যাচ খেলতে হতে পারে বিপজ্জনক গরমের মধ্যে।
জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ১০৪ ম্যাচের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এমন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে তাপমাত্রা খেলোয়াড় ও দর্শকদের জন্য নিরাপদ সীমা অতিক্রম করতে পারে। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া বিশ্বকাপের তুলনায় এই ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ।
গবেষকদের মতে, অন্তত পাঁচটি ম্যাচ এমন অবস্থায় হতে পারে যেখানে ম্যাচ স্থগিত রাখার পরামর্শ দেওয়া উচিত। বিজ্ঞানীরা ম্যাচের নির্ধারিত সময় ও ‘ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার’ (ডব্লিউবিজিটি) সূচক ব্যবহার করে এই ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছেন। এই সূচক মানবদেহ কতটা কার্যকরভাবে নিজেকে ঠান্ডা রাখতে পারে, তা পরিমাপ করে।
বিশ্ব ফুটবলারদের সংগঠন ফিফপ্রোর মেডিক্যাল পরিচালক ভিনসেন্ট গটবার্জ বলেন, ‘২০২৬ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো উচ্চ ডব্লিউবিজিটি পরিস্থিতিতে হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের ২০২৩ সালের হিসাবের সঙ্গে এই গবেষণার ফল মিল রয়েছে। গরম আবহাওয়ায় খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও পারফরম্যান্স রক্ষায় বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি।’
ফিফপ্রোর সুপারিশ অনুযায়ী, ডব্লিউবিজিটি ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে কুলিং ব্যবস্থা চালু করা উচিত এবং তা ২৮ ডিগ্রির ওপরে গেলে ম্যাচ স্থগিত করা প্রয়োজন। এটি শুষ্ক আবহাওয়ায় প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ৩০ ডিগ্রির সমতুল্য হতে পারে।
এদিকে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে তাপঝুঁকি মোকাবিলায় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- প্রতি অর্ধে তিন মিনিটের পানি বিরতি, খেলোয়াড় ও দর্শকদের জন্য কুলিং অবকাঠামো, পরিবেশভিত্তিক বিশ্রাম ব্যবস্থা এবং উন্নত চিকিৎসা প্রস্তুতি।
ফিফা এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘খেলোয়াড়, রেফারি, দর্শক, স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মকর্তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফিফা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভয়াবহ গরম ম্যাচের কৌশলও বদলে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞ ক্রিস মুলিংটনের কথায়, ‘এটি স্বাস্থ্য সংকটের চেয়ে পারফরম্যান্সের ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে। খেলোয়াড়রা নিজেদের গতি কমিয়ে খেলবে। ফলে আরও রক্ষণাত্মক ফুটবল দেখা যেতে পারে।’
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে তিনটিতে কুলিং সিস্টেম কিছুটা ঝুঁকি কমাতে পারে। কিন্তু মায়ামি, কানসাস সিটি, নিউইয়র্ক ও ফিলাডেলফিয়ার মতো শহরের স্টেডিয়ামগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
এমনকি নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য ফাইনালেও তাপমাত্রা নিরাপদ সীমা ছাড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণা বলছে, সেখানে ডব্লিউবিজিটি ২৬ ডিগ্রি ছাড়ানোর সম্ভাবনা প্রতি আটটির মধ্যে একবার এবং আরও বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছানোর ঝুঁকি প্রায় ৩ শতাংশ, যা ১৯৯৪ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ুবিজ্ঞান অধ্যাপক ফ্রাইডেরিক ওত্তো মনে করেন, ভবিষ্যতে গ্রীষ্মপ্রবণ অঞ্চলে বিশ্বকাপ আয়োজনের সময়সূচি নতুনভাবে ভাবতে হবে। তার ভাষায়, ‘স্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকাপ বছরের শুরুতে বা শেষে আয়োজন করাই ভালো। তাহলে এটি সত্যিকারের ফুটবল উৎসব হবে, পুরো শহরের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়।’
ফিফপ্রো আরও সতর্ক করেছে, ডালাস ও হিউস্টনের মতো শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়াম খেলোয়াড়দের কিছুটা সুরক্ষা দিলেও, স্টেডিয়ামের বাইরে ফ্যান জোন ও উৎসবে থাকা দর্শকদের দীর্ঘ সময় ভয়াবহ গরমের মুখে থাকতে হতে পারে।
অনিক/