ইন্টারনেট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই ডিজিটাল জগতে ঝুঁকিও কম নয়। স্ক্যাম, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও হ্যাকিংয়ের মতো অপরাধমূলক কার্যক্রম এখানে প্রতিনিয়ত ঘটে। এসব থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন অনেকে।
তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যাকারদের রুখতে আপনাকে হ্যাকার হতে হবে না। অনলাইনে নিরাপদ থাকার পদ্ধতিগুলো জটিল, কঠিন বা সময়সাপেক্ষ হওয়ার কোনো কারণ নেই। সাধারণ কিছু সতর্কতা ও সহজলভ্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে ডিজিটাল জগতে নিজের সুরক্ষা বলয় তৈরি করা সম্ভব।
নিরাপত্তা আপডেট ইনস্টল
আপনার ফোন, কম্পিউটার বা যেকোনো ডিভাইসে সফটওয়্যার আপডেটের নোটিফিকেশন আসা মাত্র তা ইনস্টল করুন। সব আপডেট হয়তো সরাসরি নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত নয়। তবে যেগুলো জড়িত, সেগুলো হ্যাকিংয়ের বিরুদ্ধে আপনার প্রথম প্রতিরোধ। ডেভেলপাররা যখন কোনো নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে পায়, তারা আপডেটের মাধ্যমে তা ঠিক করেন।
শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র পাসওয়ার্ড ব্যবহার
দুর্বল ও সহজে অনুমান করা যায় এমন পাসওয়ার্ড ডেটা চুরির অন্যতম কারণ। আপনার জন্মদিন, পোষা প্রাণীর নাম বা ‘123456’-এর মতো পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা, দীর্ঘ ও জটিল (অক্ষর, সংখ্যা ও প্রতীকের মিশ্রণ) পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। এত পাসওয়ার্ড মনে রাখা কঠিন, তাই একটি নির্ভরযোগ্য পাসওয়ার্ড ম্যানেজার অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।
টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন
পাসওয়ার্ড শক্তিশালী হলেও তা ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তাই সুরক্ষার দ্বিতীয় স্তর হিসেবে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন বা মাল্টি-ফ্যাক্টর চালু করুন। ফলে কেউ আপনার পাসওয়ার্ড জেনে ফেললেও অন্য একটি কোড বা অনুমোদন ছাড়া লগইন করতে পারবে না।
সবকিছুর ব্যাকআপ
র্যানসমওয়্যার একটি মারাত্মক সাইবার হামলা, যেখানে হ্যাকাররা ফাইলগুলো লক করে দেয় এবং মুক্তিপণের বিনিময়ে তা ফিরিয়ে দেয়। এর থেকে বাঁচার সহজ উপায় হলো নিয়মিত ডেটা ব্যাকআপ রাখা। বিশেষজ্ঞরা ‘৩-২-১’ নিয়ম মানার পরামর্শ দেন- অন্তত তিনটি কপি, দুই ধরনের স্টোরেজ (যেমন ক্লাউড ও পোর্টেবল হার্ডড্রাইভ) এবং তার মধ্যে একটি কপি মূল সিস্টেম থেকে আলাদা রাখা।
ফিশিং ও প্রতারণা শনাক্ত
বহু বড় হ্যাকিং কাণ্ড ঘটে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে নয়, বরং মানুষের সরলতা ব্যবহার করে, যাকে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বলা হয়। প্রতারকরা ব্যাংক, কুরিয়ার সার্ভিস বা কোনো কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা সেজে ই-মেইল বা মেসেজ পাঠায়। তারা ভয়, লোভ বা জরুরি পরিস্থিতি দেখিয়ে আপনার পাসওয়ার্ড বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতানোর চেষ্টা করে। যেকোনো অবিশ্বাস্য অনুরোধ পেলে সতর্ক থাকুন।
ক্লিক করার আগে লিংক যাচাই
ক্ষতিকর লিংকে ক্লিক করলে আপনার ডিভাইসে গোপনে ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস ঢুকে যেতে পারে। এটি পাসওয়ার্ড টাইপ পর্যবেক্ষণ করতে পারে (কিলগার) বা ফাইল ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কোনো লিংকে ক্লিক করার আগে কারসর লিংকের ওপর নিয়ে গেলে ব্রাউজারের নিচে বাম কোণে লিংকটির প্রকৃত ঠিকানা দেখা যাবে। যদি ঠিকানাটি সন্দেহজনক বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়, তাহলে ক্লিক করবেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত তথ্য শেয়ার না করা
অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের নাম, যাওয়ার তালিকা বা ছুটির সময়সূচি ইত্যাদি শেয়ার করেন। এই ধরনের তথ্য প্রতারকদের জন্য সহায়ক হতে পারে। তারা এটি ব্যবহার করে আপনার পাসওয়ার্ড অনুমান করতে পারে বা পরিবারের সদস্য সেজে আপনার কাছে অনুরোধ করতে পারে।
ভিপিএন ব্যবহার
ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন আপনার আইপি ঠিকানা গোপন করে এবং আপনাকে অন্য একটি সার্ভারের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত করে। বিশেষ করে পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সময় ভিপিএন ম্যান-ইন-দ্য-মিডল ধরনের অ্যাটাক থেকে রক্ষা করে।
নিয়মিত ভাইরাস স্ক্যান
ইন্টারনেট থেকে ফাইল ডাউনলোড করার সময় সতর্ক থাকুন। অনেক সময় দেখা যায় ভালো ফাইলের আড়ালে ম্যালওয়্যার থাকে। একটি মানসম্মত অ্যান্টিভাইরাস প্রোগ্রাম ব্যবহার করুন ও নিয়মিত ডিভাইস স্ক্যান করুন। উইন্ডোজ কম্পিউটারে ডিফল্টভাবে থাকা উইন্ডোজ ডিফেন্ডার অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর।
প্রাইভেসি টুল ব্যবহার
বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সাইনআপ করার সময় আপনার আসল ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার না করে ই-মেইল মাস্কিং বা বিকল্প ঠিকানা ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া গুগল বা বিংয়ের মতো সার্চ ইঞ্জিনগুলো আপনার সার্চ ডেটা সংরক্ষণ করে। এর বদলে ডাকডাকগোর মতো প্রাইভেট সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করতে পারেন, যা ব্যবহারকারীর তথ্য ট্র্যাক করে না।
ডেটা রিমুভাল সার্ভিস ব্যবহার
ইন্টারনেটে আপনার নাম, ঠিকানা বা ফোন নম্বর বিভিন্ন ডেটা ব্রোকারের কাছে থাকতে পারে, যেগুলো বিভিন্ন কাজে ব্যবহার বা বিক্রি করে। এই তথ্য মুছে ফেলতে ডেটা রিমুভাল সার্ভিস বা স্থানীয় প্রাইভেসি সেবার মাধ্যমে অনুরোধ করতে পারেন।
ডিভাইসের ভৌত নিরাপত্তা
সাইবার নিরাপত্তার একটি বড় অংশ হলো ডিভাইসের ভৌত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ল্যাপটপ বা ফোন কখনো অরক্ষিত অবস্থায় জনসমক্ষে ফেলে রাখবেন না। ফোনটি সর্বদা বায়োমেট্রিক বা পিন লক করে রাখুন। কারণ ফোন উন্মুক্ত অবস্থায় পেলে কেউ সহজে আপনার অনলাইন অ্যাকাউন্ট দখল করে নিতে পারেন।