ছবি আঁকতে শিল্পীরা কত রং, সরঞ্জামই তো ব্যবহার করেন। পানি, তেল, প্যাসট্যালসহ নানা রকম রঙের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিল্পী বিনায়ক রুকু ছবি আঁকতে ব্যবহার করেন মায়ের রান্না ঘরের মসলার সরঞ্জাম। লবণ, তেল, হলুদ, মরিচ, পানি, কাপড় ধোয়ার পাউডারের সঙ্গে আরও সব প্রাকৃতিক উপাদান মিশিয়ে তৈরি করেন ছবি আঁকার উপযোগী রং। তারপর মনের যত ভাবনা ফুটিয়ে তুলেন ক্যানভাসে।
গত ২১ থেকে ২৩ জানুয়ারি ব্যতিক্রমী এমন ৪৫টি ছবি নিয়ে হয়ে গেছে রুকুর একক প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার জোড়বাংলায় ফার্ন রোডে। ছবিগুলো দেখতে সেখানে হাজির হয়েছিলেন ছোট-বড় নানা বয়সী দর্শক। এরপরই শিল্পী ও সংস্কৃতিমনাদের আলোচনায় উঠে আসেন তিনি।
‘এক ঘর রুকুর ছবি’ নামের এই প্রদর্শনীতে ছবির মূল থিম ছিল গ্যালাক্সি। বাবার সঙ্গে শুয়ে রাতের আকাশের চাঁদ, তারা, নক্ষত্র দেখা রুকুর প্রিয় কাজ। গ্যালাক্সি ও মহাবিশ্ব নিয়ে তার অবচেতন মনের কল্পনা ফুটে উঠেছিল প্রদর্শিত ছবিতে। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন রুকু। তার আঁকা বেশ কিছু বিমূর্ত ও প্রকৃতির ছবিও দেখা যায় সেখানে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই শিল্পীর ৪৫টি ছবির ভেতর ৪২টি ছবিই কিনে নেন দর্শনার্থীরা।
শৈশব থেকেই অটিজমের বিশেষ রোগ স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ২২ বছর বয়সী রুকু। তার সফলতা ও শিল্পী হয়ে উঠার পেছনে রয়েছে বাবা মায়ের অসীম ধৈর্য, অক্লান্ত পরিশ্রমের গল্প। বাবা রণেন ভট্টাচার্য জানান, অটিজম আক্রান্ত হওয়ায় ছোটবেলায় স্কুলের অন্য বাচ্চাদের থেকে রুকু ছিল অনেকটাই আলাদা। মনের ভাব সহপাঠীদের মতো সহজে প্রকাশ করতে পারত না সে। কথা অসংলগ্ন হওয়ায় অন্য বাচ্চারা সহজে খেলায় নিতে চাইত না তাকে। অথচ রুকুও চাইতো বন্ধুদের সঙ্গে ছুটে বেড়াতে, খেলতে ও কথা বলতে। তাই অসীম ধৈর্য নিয়ে মা শুনে যেতেন সন্তানের অগোছাল কথা। মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারলে বাবা এগিয়ে দিতেন ছবি আঁকার খাতা। সেখানেই মনে যা আসে সেগুলো ছবির ভাষায় ফুটিয়ে তুলতেন রুকু। রুকুর মনের গভীরতা বুঝতে পেরেছিলেন বাবা-মা। মনের ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন দেশ-বিদেশের পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গলে। বাবার সঙ্গে শুয়ে রাতের আকাশের চাঁদ, তারা, নক্ষত্র দেখেছেন রুকু।
মা সুমন ভট্টাচার্য সব সময় আত্মবিশ্বাসী ছিলেন রুকুর ছবি আঁকার প্রতিভা নিয়ে। একপর্যায়ে চিন্তা করেন রুকুর শিল্পী সত্তা তুলে ধরতে আয়োজন করবেন একক ছবির প্রদর্শনী। সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে প্রথমে ২১টি ছবি দিয়ে শুরু করেছিলেন প্রদর্শনী। মুহূর্তেই দর্শনার্থী ও সংস্কৃতিমনাদের ভেতর সাড়া পড়ে যাওয়ায় একে একে প্রদর্শনীতে ছবির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২। রুকুর কথা একসময় অন্যরা সহজে বুঝতে পারত না। আজ তার মনের ভাবনা সবাই পড়তে পারছে ছবির ভাষায়, প্রশংসিত হচ্ছে রুকু এটাই বাবা-মা হিসেবে তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সব দেশ, সমাজেই এখনো অটিজম আক্রান্ত বিশেষ শিশু ও তরুণদের দেখা হয় অবহেলার চোখে। যত্ন ও আন্তরিকতা পেলে বিকশিত হয় তাদের ভেতর লুকিয়ে থাকা অসামান্য প্রতিভা। তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ চিত্রশিল্পী রুকু।
লেখক: কথাসাহিত্যিক

