সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র ত্যাগে রাজি নয় হামাস। গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় ইসরায়েলের প্রধান দাবি ‘হামাসকে অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে’- এর জবাবে এমন সাফ বার্তা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠনটি।
শনিবার (২ আগষ্ট) এক বিবৃতিতে হামাস জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের এক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তারা এই অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ওই বক্তব্যে উইটকফ দাবি করেছিলেন, হামাস তাদের অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে ‘ইচ্ছা প্রকাশ’ করেছে। তবে হামাস তা নাকচ করে বলেছে, ‘পূর্ণ স্বাধিকারভিত্তিক, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র এবং জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা ছাড়া তারা প্রতিরোধ ও অস্ত্র পরিত্যাগ করবে না।’ হামাস উইটকফের এমন বক্তব্যের নিন্দাও জানিয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে ইসরায়েল তুলে ধরলে দুপক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা গত সপ্তাহে স্থবির হয়ে পড়ে।
এদিকে ফ্রান্স, কানাডাসহ একাধিক পশ্চিমা দেশ সম্প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর আরব দেশগুলোও হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও গাজা শাসন ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, ইসরায়েল যদি নির্ধারিত কিছু শর্ত পূরণ না করে, তবে তারা সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে।
গত শুক্রবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান হুঁশিয়ার করে বলেন, জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত না হলে গাজায় লড়াই অব্যাহত থাকবে। এর এক দিন পর, হামাসের প্রকাশ করা এক ভিডিওতে জিম্মি এভিয়াতার ডেভিডকে অসুস্থ, কঙ্কালসার অবস্থায় এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর দেখানো হয়। তার পরিবার অভিযোগ করে, প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে হামাস তাকে অনাহারে রেখেছে। তারা ইসরায়েল সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আহ্বান জানান।
সিডনিতে হাজার হাজার মানুষের ফিলিস্তিনপন্থি পদযাত্রা
গাজায় শান্তি ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিতের দাবিতে গতকাল রবিবার অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বিখ্যাত হারবার ব্রিজে বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ ‘মানবতার জন্য পদযাত্রা’য় অংশ নেন। পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই ক্ষুধার প্রতীক হিসেবে হাঁড়ি-পাতিল হাতে নিয়ে এসেছিলেন।
বিশাল এ পদযাত্রায় বৃদ্ধ থেকে শুরু করে শিশু-পরিবার পর্যন্ত অংশ নেয়। উপস্থিত ছিলেন উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জও। অনেকে ছাতা ধরে হাঁটছিলেন, কেউ কেউ ফিলিস্তিনি পতাকা নাড়াচ্ছিলেন এবং ‘আমরাই ফিলিস্তিনি’-এমন স্লোগানে মুখর ছিলেন সবাই।
নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ জানায়, প্রায় ৯০ হাজার মানুষ এই পদযাত্রায় অংশ নেন। তবে আয়োজক সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপ সিডনি’ দাবি করেছে, ৩ লাখের মতো মানুষ এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। একই দিনে অস্ট্রেলিয়ার আরেক শহর মেলবোর্নেও ফিলিস্তিনপন্থি একটি পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
গাজায় নিহত আরও ৪৪ জন
ইসরায়েলি বাহিনীর বিরামহীন হামলায় গতকাল গাজায় অন্তত ৪৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে চিকিৎসা সূত্র। এদের মধ্যে ২২ জন মারা গেছেন ত্রাণ সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে।
ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, রবিবার ভোরে তাদের খান ইউনুস সদর দপ্তরে ইসরায়েলি বাহিনীর পরিচালিত ‘ইচ্ছাকৃত হামলায়’ তাদের এক কর্মী ওমর ইসলাম নিহত হয়েছেন। হামলায় আরও দুই কর্মী আহত হন। সংস্থাটি একে যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
এদিকে জাতিসংঘের জেনেভা দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, গাজায় ১০ লাখ নারী ও কিশোরী বর্তমানে চরম ক্ষুধার্ত অবস্থায় রয়েছেন। তারা বলেন, ‘এই ভয়াবহ পরিস্থিতি চলতে পারে না। এখনই এটি থামাতে হবে।’ জাতিসংঘের অবিলম্বে অস্ত্রবিরতি, সব নারী ও শিশুদের জন্য জীবনরক্ষাকারী সহায়তা এবং জিম্মিদের মুক্তির দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। গাজায় ইসরায়েলি অবরোধে জোরপূর্বক অনাহারে অন্তত ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯৩ জন শিশু।
আল-আকসায় প্রার্থনা করলেন বেন গভির
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির রবিবার জেরুজালেমের স্পর্শকাতর আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে পুলিশি পাহারায় ১২৫০ ইসরায়েলির দল নিয়ে পরিদর্শন করে সেখানে প্রার্থনা করেছেন বলে দাবি করেছেন। প্রাঙ্গণটিতে ইহুদি দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারলেও সেখানে প্রার্থনা করা নিষেধ। আল-আকসায় বেন গভিরের প্রবেশকে ‘উস্কানিমূলক’ অ্যাখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব, জর্ডান ও হামাস।
ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছেন, এমন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আল-আকসা প্রাঙ্গণের ওপর তাদের ঐতিহাসিক কর্তৃত্ব ক্ষয়ের মুখে পড়ছে। বিশেষত, সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের এই ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সূত্র: আল-জাজিরা