রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিম ভাইরাল হয়েছে। সেখানে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি উক্তি, ‘‘আমরা নিজেদের লোকদের ছেড়ে দিই না”। তার এমন সব নেতার সঙ্গে তোলা ছবির পাশে বসানো হয়েছে, যাদের একসময় তিনি মস্কোর “মূল মিত্র” বলে ঘোষণা করেছিলেন।
তালিকায় আছেন লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি, যিনি ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নিহত হন; সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ, যিনি ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মস্কোয় পালিয়ে যান; এবং ইউক্রেনের ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ, যিনি ২০১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মস্কোয় আশ্রয় নেন।
এর পর রয়েছে পুতিন ও তার উজ্জ্বল মুখের ভেনেজুয়েলার সমকক্ষ নিকোলাস মাদুরোর ছবি, যাকে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স কমান্ডোরা শয়নকক্ষ থেকে টেনে বের করে নিয়ে যায় এবং যিনি এখন নিউইয়র্কে মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায়।
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্সের প্রধান আলিশের ইলখামভ বলেন, “একদিকে, মাদুরো ছিলেন লাতিন আমেরিকায় পুতিনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র, তাকে হারানোয় পুতিনের মর্যাদা ও সুনামে আঘাত লেগেছে। কিন্তু পুতিনের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ট্রাম্প তার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করছেন।”
তার মতে, এই মিত্রের মূল্য নতুন বিশ্বব্যবস্থার গুরুত্বের তুলনায় কোনোভাবেই বেশি হতে পারে না, যে বিশ্বব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিষ্ঠা করছেন।
আলিশের ইলখামভ আরও বলেন, ‘‘এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নয়; বরং বলপ্রয়োগের অগ্রাধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে—যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের মূল স্তম্ভ ছিল রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব।’’
মাদুরোর ঘটনায় যা ঘটেছে, তা অনেকটাই ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ঘটনার সঙ্গে মিলে যায় যখন বিরোধী বাহিনীর হাতে সিরিয়ার দখল চলে যাওয়ার সময় দামেস্ক থেকে আতঙ্কিত হয়ে আসাদ মস্কোয় পালিয়ে যান, আর রাশিয়া সামরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে।
একটি আন্দাজ বা তত্ত্ব কোনোভাবেই ফেলে দেওয়া যায় না যে, গত আগস্টে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে ট্রাম্প ও পুতিন মাদুরোকে কার্যত ‘বাদ’ দিয়ে দেন।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশিয়া-বিষয়ক গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন বলেন “সম্ভবত অ্যাঙ্কোরেজে, বা তারও আগে, বিশ্বে প্রভাবক্ষেত্র সীমিতকরণ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছিল।’’
এই সমঝোতায় ইউক্রেন প্রশ্নে ট্রাম্পের কাছ থেকে কিছু ছাড় থাকতে পারে, যার বিনিময়ে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে হাইড্রোকার্বনের যৌথ উন্নয়ন হবে, আর ওয়াশিংটন গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাবে।
মিত্রোখিন বলেন, “গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে ট্রাম্পের অবিরাম আগ্রহও একই সূত্রে গাঁথা। সেখান থেকে তিনি বিশ্বের উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবেন।’’
এ ছাড়া রাশিয়ার বিদ্যমান তেলক্ষেত্রগুলো ফুরিয়ে এলে, পশ্চিম সাইবেরিয়ার জলাভূমি-ঘেরা সমভূমিতে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শেল তেলভাণ্ডার বাজেনোভস্কায়া সভিতার উন্নয়নেও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ‘শেল’ তেল ও গ্যাস উত্তোলনে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর অগ্রদূত হলেও রুশ কোম্পানিগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
বাজেনোভস্কায়া সভিতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে হোয়াইট হাউস একই ঢিলে আরও বড় একটি ভূরাজনৈতিক পাখি মারতে পারবে।
কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক আলেক্সেই কুশ্চ বলেন, ‘‘চীন যাতে সেখানে পৌঁছাতে না পারে এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজেনোভস্কায়া সভিতা প্রয়োজন, কারণ এটি বেইজিংয়ের জ্বালানি স্বনির্ভরতার ভিত্তি গড়ে দিতে পারে,”
আলেক্সেই কুশ্চ আরও বলেন, মাদুরোকে হারানো রাশিয়ার জন্য বড় কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না, কারণ ক্রেমলিন-প্রভাবিত গণমাধ্যম ও জনপরিচিত ব্যক্তিরা মাদুরোকে দুঃসাহসিকভাবে ধরে নেওয়ার ঘটনাকে ওয়াশিংটনের “সাম্রাজ্যবাদ” আখ্যা দিয়ে সমালোচনা চালাচ্ছেন।
ট্রাম্পের আরও ঘনিষ্ঠ হবেন না পুতিন
আরেক বিশেষজ্ঞের মতে, মাদুরোকে ছেড়ে দেওয়ায় পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত হবে না।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেন নাকি গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ায় ভ্যালদাইয়ে পুতিনের বাসভবনে তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল, পুতিনের এই দাবি তিনি “বিশ্বাস করেন না”।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশেষজ্ঞ গালিয়া ইব্রাগিমোভা বলেন, “মাদুরোকে ধরে নেওয়ার ঘটনায় চোখ বন্ধ করে রাখলেও পুতিন ট্রাম্পের কাছাকাছি যাবেন না।”
তিনি বলেন, ‘‘পুতিন সবচেয়ে বেশি ভীত এই কারণে যে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে এমন কেউ ছিল, যে তথ্য আমেরিকানদের কাছে ফাঁস করেছে। আর এখন পুতিন প্রথমেই নিজের নিরাপত্তা জোরদার করবেন, কারণ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের এক ধরনের সন্দেহপ্রবণতা রয়েছে সবচেয়ে বেশি।’’
মাদুরোকে তুলে আনার ঘটনা পুতিনকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অপহরণের পরিকল্পনাতেও প্ররোচিত করতে পারে, বলেন তিনি।
২০০০-এর দশকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর, মস্কোর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের দিকে ঝোঁক বাড়লেও পুতিন মাদুরোর সমাজতান্ত্রিক পূর্বসূরি ও মেন্টর হুগো চাভেজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
চাভেজ রুশ-নির্মিত ট্যাংক, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রসহ নানা অস্ত্র কিনতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন; এমনকি ভেনেজুয়েলায় একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল তৈরির একটি কারখানাও খোলে মস্কো।
ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক লাইফলাইন ক্ষেত ভারী ও উত্তোলনে কঠিন অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণে রুশ বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তবে তাদের পুরোনো প্রযুক্তি ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনের পতন ঠেকাতে পারেনি; যা বছরের পর বছর ধরে অর্থনৈতিক ধস, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং ভূতত্ত্ববিদ থেকে প্রকৌশলী পর্যন্ত সবাই তেল খাতের মেধাপাচার ডেকে আনে।
২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর মাদুরো পুতিনের সঙ্গে এক ডজনবার সাক্ষাৎ করেন; মস্কো সফরের প্রতিবারই ছিল লালগালিচা সংবর্ধনা, আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন এবং “চিরন্তন বন্ধুত্ব”-এর বাগাড়ম্বরপূর্ণ আশ্বাস।
ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অক্টোবরে মাদুরো পুতিনকে অনুরোধ করেছিলেন রাশিয়া সরবরাহকৃত এস-৩০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাতে, রুশ-নির্মিত সুখোই সু-৩০ যুদ্ধবিমান মেরামত করতে, এবং রাডারসহ অন্যান্য অনির্দিষ্ট লজিস্টিক সহায়তা দিতে।
তিনি একটি অর্থায়ন পরিকল্পনা ও চান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়; তবে মস্কো এ অনুরোধে সাড়া দিয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এদিকে, ক্রেমলিনপন্থী কণ্ঠগুলো মাদুরোর পতনকে মস্কোবিরোধী একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে যা নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবে।
আজ মঙ্গলবার রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা রিয়া নভোস্তিতে এক মতামত কলামে বিশ্লেষক কিরিল স্ত্রেলনিকভ লেখেন,“আমাদের শুধু এটা বুঝতে হবে যে সমষ্টিগত পশ্চিম কখনোই রাশিয়াকে পরাজিত করার চেষ্টা ছাড়বে না, চেষ্টা করতে পারেন কিন্তু ওপর থেকে ভয়াবহভাবে পড়ে ব্যথা পাবেন।”