বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায় গণ-অভ্যুত্থানের সময় বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে প্রায় প্রাণ হারাতে বসেছিলেন রাহাত হোসাইন। তিনি পুলিশের গুলিতে আহত ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়াকে নিরাপদে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন- এমন একটি ভিডিও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ওই বিক্ষোভে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন। তাদের বেশির ভাগই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে চালানো নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে প্রাণ হারান। এই অভ্যুত্থানকে বিশ্বজুড়ে জেনারেশন জেড (জেন জি)-এর আন্দোলনগুলোর মধ্যে প্রথম ও সবচেয়ে সফল হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশে আন্দোলনের কিছু ছাত্রনেতা পরে অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। তারা যে দেশের জন্য রাজপথে নেমেছিলেন, সেই দেশের রূপ কেমন হবে, তা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বহু দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বাইরে তারা ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ভূমিকা রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রদের গড়া নতুন দলটি গভীর বিভক্তিতে ভোগে এবং আন্দোলনে নারী অংশগ্রহণকারীরা অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় এ পরিস্থিতিতে শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এসেছে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো।
রাহাত বিবিসিকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তার কল্পিত ‘শান্তি, সমতা, ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতার ওপর ভিত্তি করে সুন্দর বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। এই হতাশায় তিনি একা নন। আরও অনেকেই ভুগছেন। ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিকে (এনসিপি) অনেকেই অনভিজ্ঞ মনে করছেন। রাহাত বরং মুগ্ধ হয়েছেন অনেক পুরোনো একটি দল জামায়াতে ইসলামীকে দেখে।
ইসলামপন্থি এই দলটি অতীতে ছোটখাটো জোটসঙ্গী হিসেবে ছিল। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে দলটি নিজস্ব গতি পেয়েছে। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত জামায়াতের সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিতর্কিত অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিনের বিতর্ক জড়িয়ে আছে। সেই যুদ্ধে লাখো মানুষ নিহত হন, এক কোটির বেশি মানুষ ঘরছাড়া হন। জামায়াতের কিছু নেতার বিরুদ্ধে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার ঘোরতর অভিযোগ ছিল। তবে এই ইতিহাস রাহাতকে তেমন বিচলিত করে না। তার বিশ্বাস, জামায়াত এখন আধুনিক হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধা ও ছাত্রদের জামায়াত বিভিন্নভাবে সমর্থন দিয়েছে।’
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিবিসিকে বলেন, দলটি দুর্নীতি দূর করা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করছে। ঐতিহাসিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি দেশে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হলেও অনেকের কাছে তা সাড়া ফেলেছে।
ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌফিক হক বলেন, ১৯৭১-এর বহু পরে জন্ম নেওয়া তরুণ ভোটাররা জামায়াতকে তার অতীত থেকে আলাদা করে দেখতে পারেন এবং এটিকে ‘লাল রেখা’ বলে মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘এটা প্রজন্মগত বিষয়।’ তাদের অনেকেই এই বিতর্কে ‘আটকে থাকতে চান না।’
বরং হাসিনার আমলে নিষিদ্ধ হওয়া ও অনেক নেতার কারাবন্দি হওয়ার কারণে তরুণরা জামায়াতকে নিজেদের মতোই ভুক্তভোগী হিসেবে দেখেছেন বলে মনে করেন তিনি। রাহাত একা নন। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতপন্থি ছাত্র সংগঠনের সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুলরূপে জয় পান। এটি জাতীয় রাজনৈতিক মেজাজের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো ইসলামপন্থি দল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এটাই ছিল ছাত্রনেতাদের জন্য প্রথম বড় সতর্কসংকেত। বিশেষ করে এমন এক দেশে যেখানে প্রায় ১০ জন ভোটারের মধ্যে ৪ জনের বয়স ৩৭-এর নিচে।
এনসিপির নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা আরও ভালো করতে চেয়েছিলাম।’ তবে তার যুক্তি, ‘গত ৫০ বছর ধরে মাত্র দুটি দলই বাংলাদেশ শাসন করেছে… আমরা নিজেদের প্রমাণ করার চেষ্টা করছি।’
আসিফ মাহমুদের মতে, কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকলেও জামায়াতের তৃণমূল সংগঠনের সহায়তা দরকার ছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় বলেছি আমরা ইসলামপন্থি দল নই। এটা আদর্শগত জোট নয়।’
তবে জামায়াতে ইসলামী যে ৩০টি আসনে এনসিপিকে প্রার্থী দিতে দিচ্ছে, সেখানে নারী মাত্র দুজন। আর জামায়াতে ইসলামী নিজে যে ২০০-এর বেশি প্রার্থী দিচ্ছে, তাদের সবাই পুরুষ। এনসিপির সিনিয়র নারী নেত্রী তাসনিম জারা এটিকে ‘নৈতিক লাল রেখা’ বলে অভিহিত করেছেন। এ এক বিরাট মতাদর্শগত অবক্ষয়। আর কারণেই তিনি ও আরও কিছু লোক দল ছাড়েন। অন্যদিকে ২৫ বছর বয়সী আন্দোলন নেত্রী শিমা আখতার বলেন, ‘ওরা আমাদের পাশ কাটিয়ে দিতে চেয়েছে।’ তিনি বলেন, অভ্যুত্থানে নারীরা বড় ভূমিকা রাখলেও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এখনো পুরুষশাসিত। অভ্যুত্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু হয়। শিমা বলেন, ‘কিছু মিম ও ভিডিও এতটাই সহিংস আর হতাশাজনক ছিল…. আমাদের চরিত্রহনন করা হয়েছে, ট্রল করা হয়েছে।’ দুই দলই ‘নারী বাদ’ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এটি বাংলাদেশের ‘সামাজিক কাঠামোর’ ফল। এর পরও জামায়াতে ইসলামীর ডা. শফিকুর রহমান জানান, পরিস্থিতি বদলাবে বলে আশা করেন তিনি।
শিমা এই যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘এটা শুধু পিতৃতান্ত্রিক অজুহাত।’ তিনি এখন বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন, যারা ২৫০-এর বেশি প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘খারাপের চেয়ে ভালো।’
এনসিপির দুর্বলতা ও আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা বিএনপিকে সুবিধা দিচ্ছে। দলটি নিজেকে উদার গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে। আওয়ামী শাসনে হাজারও নেতা-কর্মীর কারাবাসের পর বিএনপি এখন সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দল হয়ে উঠেছে এবং ছাত্রদের দলটিকে আরও কোণঠাসা করছে। আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও রাজনৈতিক বংশের সঙ্গে যুক্ত। দলটির নতুন নেতা তারেক রহমান প্রয়াত খালেদা জিয়ার ছেলে।
বিএনপির সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বর্তমান প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আপনি রাজনৈতিক বংশ থেকে এসেছেন কি না, সেটা অপ্রাসঙ্গিক।’ পরিহাসের বিষয় হলো, এই বংশগত রাজনীতির ধারাবাহিকতা সম্ভব হয়েছে ছাত্র অভ্যুত্থানের কারণেই। এর ফলে ১৭ বছর স্বেচ্ছা নির্বাসনের পর তারেক রহমান ফিরতে পেরেছেন। হাসিনার পতনের পর তিনি ও তার মা দুর্নীতির মামলা থেকে খালাস পান, যেগুলোকে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছিলেন। সূত্র: বিবিসি