বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোনো একক ইস্যুর কাছে ‘জিম্মি’ থাকবে না এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে কোনো বাধা হবে না। ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ মন্তব্য করেন।
বিএনপি আজ মঙ্গলবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। তার আগে ঢাকার গুলশানে দলের কার্যালয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে এবং ভারতের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাকে বিচারের মুখোমুখি করার ব্যাপারে জনগণের জোর দাবি রয়েছে এবং আমরা মনে করি ভারতের উচিত তাকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা। কিন্তু শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত না দিলেও বাণিজ্যিক সম্পর্কসহ বৃহত্তর সম্পর্ক গড়ে তোলায় তা কোনো বাধা হবে না। আমরা আরও ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোনো এক ইস্যুর কাছে ‘জিম্মি’ থাকা উচিত নয়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা ভারতে আশ্রয় নেন। অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার তাদের হস্তান্তরের অনুরোধ জানালেও গত ১৭ মাসে ভারত এ বিষয়ে কোনো সাড়া দেয়নি। এ প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, শেখ হাসিনা এবং বিদ্রোহের সময় হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত মন্ত্রী ও আমলাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলবে।
শেখ হাসিনার আমলে খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ফখরুল ইসলাম। সে সময় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন। ফখরুল বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু কঠিন ইস্যু আছে, কিন্তু তা সহযোগিতার খোলা ক্ষেত্রগুলোকে ছাপিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বহু জটিলতা রয়েছে, তবু তারা একে অপরের সঙ্গে কাজ করছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও আমাদের একটিমাত্র ইস্যুতে আটকে থাকা উচিত নয়।’
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা যখন ভারতে অবস্থান করছিলেন, তখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভারতে সফর করেছিলেন এবং ঢাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে আতিথ্য দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দিল্লি সফর করে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, যখন শেখ হাসিনা রাজনৈতিক অভিষেকের জন্য দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এটাই রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি বলেও মন্তব্য করেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, আগামী বছরের আগেই গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে ফারাক্কার পানির বিষয়টি সামনে আসবে। এ ছাড়া সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারি না। আমাদের কথা বলতে হবে। যারা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের কথা বলে, তারা পাগলের মতো কথা বলে।’
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ফখরুলও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে। তারেক রহমান গত রবিবার জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিশোধ ও সহিংসতা সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ গঠনে বাধা সৃষ্টি করে। ২০২৪ সালের আগস্টের সহিংস গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার পুনর্মিলন ঘটাতে পারেনি, কারণ ‘অভ্যুত্থানের নেতারা অধ্যাপক ইউনূসকে বেছে নিয়েছিলেন’ এবং ‘অধ্যাপক ইউনূস অভ্যুত্থানের নেতারা যে সীমারেখা দিয়েছিলেন, তার বাইরে যেতে পারেননি।’
বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি তুলে ধরে ফখরুল বলেন, এটি ভারত ও বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য, ব্যবসা, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো খাতে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষায় ভারতের সম্পদ রয়েছে এবং আমাদের বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণ আছে। তাদের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করা দরকার, যাতে তারা উপসাগরীয় দেশে কাজ পেতে পারে।’
তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা সামলাতে হবে নতুন সরকারকে এবং বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে দেখা হবে কোন মেগা প্রকল্পগুলো অপ্রয়োজনীয় বা অপচয়মূলক। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এসব প্রকল্পের মধ্যে যেগুলো বাংলাদেশের স্বার্থে উপকারী, সেগুলো আমরা রেখে দেব।’ সূত্র: দ্য হিন্দু