ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এখনো থামেনি। দুই পক্ষের হামলা অব্যাহত রয়েছে। তবে এক মাস ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দেওয়া এই সংঘাতের মাঝেই হঠাৎ করে কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন গতি পেয়েছে—যা সংঘাত শুরুর পর থেকে সবচেয়ে সক্রিয় বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনব্যাপী বৈঠক রবিবার (২৭ মার্চ) ইসলামাবাদে শুরু হয়েছে। এতে পাকিস্তানের রাজধানী দ্রুতই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সরাসরি আলোচনার টেবিলে আনা।
শেহবাজ-পেজেশকিয়ান ফোনালাপ
বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ৯০ মিনিটের ফোনালাপ করেন। পাঁচ দিনের মধ্যে এটি ছিল তাদের দ্বিতীয় আলোচনা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আলাপের মূল বিষয় ছিল উত্তেজনা প্রশমন এবং আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘বিশ্বাস’ যার অভাব তেহরানের মতে পূর্ববর্তী সব আলোচনাকে ব্যর্থ করেছে।
পেজেশকিয়ান শরিফকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের পারমাণবিক আলোচনার সময়ও ইরান দুই বার হামলার শিকার হয়েছিল। একদিকে আলোচনা, অন্যদিকে হামলা—এই দ্বৈত অবস্থান ওয়াশিংটনের প্রতি ইরানের অবিশ্বাস আরও গভীর করেছে।’ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘সরাসরি সংলাপে যেতে হলে আগে আস্থা তৈরির পদক্ষেপ নিতে হবে।’
চার দেশের কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম: যেভাবে গড়ে উঠল
ইসলামাবাদের এই বৈঠক হঠাৎ করে আয়োজন করা হয়নি। চলতি মাসের শুরুতে রিয়াদে মুসলিম ও আরব দেশগুলোর একটি বৃহত্তর বৈঠকে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। সেখান থেকেই চার দেশের একটি কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে, যেখানে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিচ্ছে।
মূলত বৈঠকটি তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় হওয়ার কথা থাকলেও, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে পাকিস্তানের সক্রিয় ভূমিকার কারণে স্থান পরিবর্তন করে ইসলামাবাদে আনা হয়।
একই সময়ে চীনও পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়েছে এবং ইরানকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে উৎসাহ দিয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বৈশ্বিক শক্তিগুলোও ধীরে ধীরে এই আঞ্চলিক উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি নয়, সরাসরি সংলাপের পথ তৈরি
কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের বৈঠকের লক্ষ্য তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা নয়। বরং আঞ্চলিক অবস্থানগুলো সমন্বয় করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সরাসরি সংলাপের ভিত্তি তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য। এখন কূটনৈতিক উদ্যোগ আর তাত্ত্বিক পর্যায়ে নেই—একটি প্রস্তাবনা নথি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে এবং বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে সেটির পরবর্তী অগ্রগতির জন্য।
কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান যোগাযোগ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে কয়েক দিনের মধ্যেই বৈঠক হতে পারে, যা সম্ভবত পাকিস্তানেই অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নামও সম্ভাব্য আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় রয়েছে। তবে এসব সময়সূচি এখনো অনিশ্চিত। এক কূটনীতিক আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এমন বৈঠক হওয়ার আগে ওয়াশিংটনকে অন্তত সাময়িকভাবে হামলা বন্ধের ঘোষণা দিতে হতে পারে, যা ইরানের আস্থা তৈরির শর্ত পূরণ করবে।’
পাকিস্তানের ভূমিকা: বার্তাবাহক, সিদ্ধান্ত নয়
পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের দাবি-দাওয়াগুলো ইসলামাবাদ ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তবে এখানেই তাদের ভূমিকা শেষ। তার ভাষায়, ‘আমরা ঘোড়াকে পানির কাছে নিতে পারি, কিন্তু সে পানি পান করবে কি না, তা পুরোপুরি তার নিজের সিদ্ধান্ত।’
ইরানের দাবি কী?
ইসলামাবাদের বৈঠকে ইরানের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করা হবে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, ইরান ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মাধ্যমে তাদের জবাব পাঠিয়েছে। তেহরানের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে–তাৎক্ষণিক যুদ্ধ বন্ধ, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালিতে তাদের কৌশলগত প্রভাব স্বীকৃতি দেওয়া।
শেহবাজ শরিফের সঙ্গে আলোচনায় পেজেশকিয়ান সতর্ক করে বলেন, ‘ইসরায়েল সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে চাইছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অন্য দেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের অবস্থান হলো–যেকোনো সংলাপ পারস্পরিক সম্মান এবং ইরানি নাগরিক ও কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড বন্ধের পরিবেশে হতে হবে।’
পাকিস্তান একদিকে ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামোর ওপর ইরানের হামলার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এতে বোঝা যায়, আঞ্চলিক শক্তিগুলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে, আবার অন্যদিকে সংঘাত যাতে আরও বিস্তৃত না হয়, সে চেষ্টা করছে।
ইসলামাবাদের এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের কোনো প্রতিনিধি সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। এটি মূলত আলোচনার প্রস্তুতিমূলক ধাপ। এর লক্ষ্য হলো উত্তেজনা প্রশমন নিয়ে আঞ্চলিক ঐকমত্য তৈরি করা এবং বিভিন্ন মধ্যস্থতা উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো, যাতে একটির সঙ্গে অন্যটির সংঘাত না হয়। কূটনীতিকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়েই নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেই আলোচনায় বসার রাজনৈতিক সুযোগ পাবে।
আগামী ৭২ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ
কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যেই বোঝা যাবে কূটনৈতিক এই উদ্যোগ বাস্তবে কোনো বৈঠকে রূপ নেয় কি না। পাকিস্তান ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে কথা বলেছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে একত্র করেছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করেছে। এখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ইসলামাবাদে নয়, বরং ওয়াশিংটন ও তেহরানে নেওয়া পদক্ষেপের ওপর।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এই মুহূর্তে ইরান যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। যদি অবিশ্বাস ও চলমান সংঘাতের কারণে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, তবে আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা