জাপানের টোকিওর এক রাস্তার মোড়ে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে ভিজে যাওয়া প্ল্যাকার্ড আর কাদা মাখা পতাকা হাতে জড়ো হচ্ছিল জনতা। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে বড় বড় জাপানি কাঞ্জি অক্ষরে লেখা মাত্র দুটি শব্দ–‘যুদ্ধ নয়’।
এই স্লোগান এখন জাপানে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দেশটিতে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ক্ষমতায় আসার পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দেশটির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী নীতি থেকে বড় ধরনের সরে আসার পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি অস্ত্র রপ্তানির দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়েছেন এবং বিদেশে জাপানের সামরিক ভূমিকা বাড়িয়েছেন।
সরকার বলছে, ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাপূর্ণ আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়। তবে অনেক জাপানির কাছে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। জাপান ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, এমন আশঙ্কা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভও গতি পাচ্ছে।
জাপানে সাধারণত জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ তুলনামূলক শান্ত ও সংযত হয়। সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলার একটি শক্ত সাংস্কৃতিক ধারণা সেখানে রয়েছে। তাই যখন বিপুলসংখ্যক মানুষ রাস্তায় নামেন, তখন তা সাধারণত গভীর কোনো উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। এবার সেই উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু জাপানের জাতীয় পরিচয়।
পরিবর্তনের পথে প্রধানমন্ত্রী
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান নতুন সংবিধান গ্রহণ করে। এর মধ্যে থাকা ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে যুদ্ধকে রাষ্ট্রীয় অধিকার হিসেবে পরিত্যাগ করা হয় এবং সশস্ত্র বাহিনী রক্ষার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
কিন্তু তাকাইচির মতে, বর্তমান বাস্তবতায় এই কাঠামো আর কার্যকর নয়। ভৌগোলিকভাবে জাপান এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে রয়েছে শক্ত অবস্থানে থাকা চীন, অনিশ্চিত উত্তর কোরিয়া এবং কাছেই রাশিয়া। এ ছাড়া ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘদিন ধরে টোকিওকে আরও সক্রিয় নিরাপত্তা ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। অবশ্য জাপানের যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার তালিকায় তাকাইচিই প্রথম নন।
গত কয়েক দশক ধরে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির রক্ষণশীল নেতারা ১৯৪৭ সালের সংবিধান সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করে আত্মরক্ষা বাহিনীর ভূমিকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে ছিলেন।
আবের আমলে ২০১৫ সালে জাপানের পার্লামেন্ট একটি বিতর্কিত নিরাপত্তা বিল পাস করে, যার মাধ্যমে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বাড়ানো হয়। এতে সীমিত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ এবং মিত্র দেশ আক্রান্ত হলে তাদের সহায়তা করার সুযোগ তৈরি হয়। তবে গত ২১ এপ্রিল জাপান সরকার আরও বড় পদক্ষেপ নেয়। তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়। সরকারের দাবি, ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠা নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে মিত্র দেশগুলোর একে অপরকে সহায়তা করা জরুরি।
এই সিদ্ধান্ত জাপানের জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাইরে বৃষ্টি থেমে সূর্যের আলো ফুটে উঠতেই জনতা আরও বাড়তে থাকে, স্লোগানও জোরালো হয়ে ওঠে। শুধু বয়স্ক প্রজন্ম নয়, ২০ ও ৩০ বছরের তরুণ-তরুণীরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ত্রিশোর্ধ্ব আকারি মায়েজোনো হাতে রঙিন কাগজের লণ্ঠন নিয়ে শান্তির আহ্বান জানাচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘জনগণের মতামত সঠিকভাবে না শুনেই এমন পরিবর্তন আনা হতে পারে, এটি আমাকে ক্ষুব্ধ করে।’
পাশেই লাল ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক প্রবীণ ব্যক্তি।
তিনি বলেন, ‘জাপানের সংবিধান, বিশেষ করে ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। এই অনুচ্ছেদই জাপানকে অতীতের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের মতো সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করেছে। এটি না থাকলে আমরা হয়তো এতদিনে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তাম।’
‘আর যুদ্ধ নয়’
জাপানের ১৯৪৭ সালের সংবিধান কার্যকর হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছর পর। তখন যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমা ফেলে দেশটিকে পরাজিত করে। ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ এসব হামলায় প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
বিশেষ করে যারা যুদ্ধ এবং পারমাণবিক হামলার স্মৃতি এখনো বহন করছেন, তাদের কাছে শান্তিবাদ থেকে যেকোনো সরে আসা গভীর আতঙ্কের কারণ। সম্প্রতি হিরোশিমার পারমাণবিক বোমা হামলার বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা জাতিসংঘে পারমাণবিক অস্ত্র বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছেন। তারা যুদ্ধ ও পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত মানবসমাজ গঠনের আহ্বান জানান।
২০২৬ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি পর্যালোচনা সম্মেলনে বক্তব্য দেন জিরো হামাসুমি। তিনি একজন ‘হিবাকুশা’, জাপানি ভাষায় পারমাণবিক বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে এ উপাধিতেই ডাকা হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম বলেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।’ তার ভাষায়, ‘আর যুদ্ধ নয়, আর হিবাকুশা নয়।’
অনেকের আশঙ্কা, জাপান আবারও কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। সেই উদ্বেগ এখন রাস্তায় রাস্তায় প্রতিফলিত হচ্ছে। টোকিও ছাড়াও ওসাকা, কিয়োটো ও ফুকোকার মতো বড় শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোর কারণে সপ্তাহে সপ্তাহে সমাবেশে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গেছে। সূত্র: বিবিসি