হরমুজ প্রণালির অবরোধ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাবের অপেক্ষায় ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসন শুক্রবারের মধ্যে প্রতিক্রিয়া আশা করলেও তেহরান জানিয়েছে, তারা এখনো প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। যেকোনো চুক্তি অবশ্যই ‘ন্যায়সংগত ও ব্যাপক’ হতে হবে বলে জোর দিয়েছে ইরান।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওয়াশিংটন একটি ১৪ দফা প্রস্তাব পেশ করে। শর্ত অনুযায়ী ইরানকে কমপক্ষে ১২ বছর পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে খুলে দিতে হবে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস এই পথেই পরিবহন করা হয়। বিনিময়ে কয়েক দশক ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর শুরু হওয়া আলোচনায় হরমুজ প্রণালি ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবে ইরানকে ১২ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করতে ও ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ইরানকে তাদের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে হবে। ওয়াশিংটন চায়, ইরান যেন অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের স্তরে না পৌঁছাতে পারে।
ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্তে উত্তেজনা বেড়েছে। জলপথের কাছে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরান এই জলপথটি অবরোধ করে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ‘খুব শিগগির’ ইরানের জবাব জানতে পারবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতালির রোমে সাংবাদিকদের বলেন, ‘জবাবে কী থাকে আমরা দেখব। আশা করা যায় এটি একটি গুরুতর আলোচনা প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাবে।’ ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, দুই পক্ষের মধ্যে ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে। চুক্তি হওয়া ‘খুবই সম্ভব’।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, তেহরান এখনো প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে।
আল-জাজিরার সংবাদদাতা রেসুল সেরদার আতাস জানান, শুক্রবার জবাব দেওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি। বিলম্বের প্রধান কারণ মার্কিন প্রস্তাবটি ‘অত্যন্ত প্রযুক্তিগত একটি খসড়া’। ইরানি আলোচকরা খসড়ার প্রতিটি তারিখ ও শব্দ নিয়ে উদ্বিগ্ন। যেকোনো জবাব পাঠানোর আগে ইরানের একাধিক ক্ষমতা কেন্দ্রের অনুমোদন ও সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইর ‘সবুজ সংকেত’ আবশ্যক।
দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, ইরানিরা হয়তো বোঝাতে চাইছে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বেশি। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের কূটনৈতিক আলোচনায় অধৈর্য এবং দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করতে চায়।
আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইরানি কর্মকর্তারা একটি ‘তিন পর্যায়ের পদ্ধতি’ অনুসরণ করছেন। ৩০ দিনব্যাপী প্রথম পর্যায়ে তেহরান ‘সব রণাঙ্গনে’ যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার লক্ষ্যে আলোচনা চালাতে চায়। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও থাকবে।
আমেরিকানদের পক্ষে এই নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। ১৭ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি থাকলেও হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ২ মার্চ সংঘাত শুরুর পর থেকে ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত ও প্রায় ৮ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন।
ইরান চায় হামলা পুনরায় শুরু না হওয়ার নিশ্চয়তা আসুক জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে। তাদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ মুক্তি, মার্কিন অবরোধের অবসান ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। তবে ইরান এখন এই জলপথে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার ব্যাপারে অনড়।
মার্কো রুবিও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ রাখতে দেবে না। শুক্রবার স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক পোস্টে তিনি আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর কোনো দেশের একচ্ছত্র দাবির বিরোধিতা করেন।
অন্যতম অমীমাংসিত বিষয় হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরানিরা তাদের স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলতে বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে রাজি হচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন নেতৃত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘যখনই কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ আসে, যুক্তরাষ্ট্র বেপরোয়া সামরিক অভিযানের পথ বেছে নেয়।’ সূত্র: আল-জাজিরা