রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে জাতিসংঘের ১০ লাখ ডলারের ত্রাণ সামগ্রী নষ্ট হয়েছে। চলতি সপ্তাহে পূর্ব ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে অবস্থিত জাতিসংঘের ত্রাণ সামগ্রীর গুদামে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় রাশিয়া। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা গতকাল শুক্রবার এসব তথ্য জানায়।
পোল্যান্ড থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে বক্তব্য দিতে গিয়ে কিয়েভে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি বার্নাডেট ক্যাসটেল-হলিংওয়ার্থ জানান, গত বুধবারের ওই হামলায় জরুরি আশ্রয়সামগ্রী, ঘুমানোর ম্যাট ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কিট রাখা গুদামটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এতে দুজন নিহত হন।
ইউএনএইচসিআর জানায়, এসব ত্রাণসামগ্রী ইউক্রেনের সম্মুখ সারির এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত ও যুদ্ধপীড়িত মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। চলমান জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি ও সরিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতিতে এই ক্ষতি জরুরি সহায়তা কার্যক্রমকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ক্যাসটেল-হলিংওয়ার্থ বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কারণ এই প্রথম ইউএনএইচসিআরের কোনো স্থাপনা সরাসরি লক্ষ্যবস্তু বা হামলার শিকার হয়েছে।’ ইউএনএইচসিআর আরও জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে মানবিক সহায়তা বহনকারী বহরে হামলার ঘটনাও বেড়েছে।
গত সপ্তাহে মানবিক সহায়তাকর্মীদের বহনকারী জাতিসংঘের দুটি গাড়িতেও ড্রোন হামলা হয়। গাড়ি দুটি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল। এর মধ্যে একটি ট্রাক দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছিল, আরেকটি বহর খেরসন অঞ্চলের অস্ত্রিভ এলাকায় যাওয়ার পথে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
অন্যদিকে রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্ব ইউক্রেনের রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত লুহানস্ক অঞ্চলে একটি ছাত্রাবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় অন্তত ৪ জন নিহত এবং ৩৫ শিশু আহত হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্বাধীনভাবে এসব তথ্য যাচাই করতে পারেনি। ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইউক্রেন লুহানস্ক অঞ্চল পুনর্দখলের চেষ্টা করছে, যেটিকে ২০২২ সালে মস্কো নিজেদের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। কিয়েভ একে অবৈধ ভূখণ্ড দখল বলে আখ্যা দেয়।
যুদ্ধের দুই পক্ষই বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। রাশিয়ার মানবাধিকার কমিশনার ইয়ানা লানত্রাতোভা জানান, হামলার সময় লুহানস্ক পেডাগজিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্টারোবিলস্ক কলেজের হোস্টেলে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৮৬ কিশোর ঘুমিয়ে ছিল।
লুহানস্কে রাশিয়া-সমর্থিত শীর্ষ কর্মকর্তা লিওনিদ পাসেচনিক বলেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনো আটকে পড়া শিশুদের খোঁজ চলছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই হামলাকে ‘ভয়াবহ অপরাধ’ বলে উল্লেখ করে দায়ীদের শাস্তির দাবি জানান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, যেখানে শিশু ও তরুণরা অবস্থান করছিল।’
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গতকাল জানান, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভল তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। এটি ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
টেলিগ্রামে জেলেনস্কি বলেন, ‘রাতভর ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী ইয়ারোস্লাভল তেল শোধনাগারসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান চালিয়েছে।’ রাশিয়ার তেলশিল্পে বিঘ্ন সৃষ্টি ও যুদ্ধের অর্থায়নের উৎস দুর্বল করতেই ইউক্রেন এসব হামলা জোরদার করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে একই স্থাপনায় একাধিকবার হামলার কৌশলও গ্রহণ করেছে কিয়েভ।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মে মাসে এখন পর্যন্ত তারা রাশিয়ার ১১টি তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কিরিশি শোধনাগারও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোন হামলার কারণে মধ্য রাশিয়ার প্রায় সব বড় তেল শোধনাগারই উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র ও সরকারি তথ্য।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধকে রাশিয়ার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, এটিই ন্যায্য।’ এদিকে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে গতকাল জরুরি বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন রাশিয়া নিযুক্ত গভর্নর ইয়েভগেনি বালিৎসকি। তবে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।
খেরসনের রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত অংশের প্রশাসনিক প্রধান ভ্লাদিমির সালদো জানান, ড্রোন হামলার পর অঞ্চলটির ৯টি এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল ভোরে মস্কো, ইয়ারোস্লাভল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে রুশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় ছিল বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানান, রাজধানীর দিকে আসা চারটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। ইয়ারোস্লাভল ও লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, রাতভর রাশিয়া মোট ২১৭টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় সুমি অঞ্চলে রুশ গোলাবর্ষণ ও ড্রোন হামলায় ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরসহ অন্তত ১১ জন আহত হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় পুলিশ জানিয়েছে। রয়টার্স স্বাধীনভাবে এসব সামরিক কর্মকাণ্ডের তথ্য যাচাই করতে পারেনি। সূত্র: রয়টার্স