গত বছরের ১৬ অক্টোবরের ঘটনা। অফিসে বসে আছি। চমৎকার রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকাল। তবে আবহাওয়া তেমন একটা গরম না। ক্লাস শুরু হতে প্রায় ২ ঘণ্টা বাকি। অতএব, বসে না থেকে সময়টা কাজে লাগানো যাক। ক্যামেরা হাতের কাছেই ছিল। দেরি না করে ক্যামেরা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে ফরেস্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অনুষদের আমলকী বাগানের দিকে গেলাম। গাছে থোকায় থোকায় আমলকী, তবে এখনো তেমন একটা বড় হয়নি। কিন্তু ড্রাগন ফলগুলো পেকে টকটকে লাল হয়ে আছে। আর সে পাকা ফল খাচ্ছে কোকিল ও ভাত শালিকের দল। ওদের কয়েকটি ছবি তুলে ‘এক্স সিটু জিন ব্যাংক’ অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানের দিকে হাঁটা দিলাম। পথে তিলাঘুঘু, সাত ভায়লা, ছোট ফুলঝুড়ি, বাদামি কাঠবিড়ালি, নানা প্রজাতির প্রজাপতি ও ফড়িং দেখলাম।
উদ্যানে ঢোকার মুখে টুনটুনির দেখা পেলাম। ওর ছবি তুলে উদ্যানে ঢুকতেই পেঁপেগাছে কালো রঙের পুরুষ কোকিল দেখলাম। সে পাকা পেঁপে খাচ্ছে। উদ্যানের লেকে ছোট পানকৌড়ি ও কানি বককে মাছ শিকারের জন্য পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। লেকের অন্য পাড়ে দুটি শিয়াল বসে ছিল। হঠাৎ ওদের একটি দাঁড়িয়ে কসরত করা শুরু করল। দ্রুত ওর ছবি তুললাম। আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম তার ঠিক পাশে একটি বড় আকাশমণিগাছে শ্বেতাক্ষী ও বুলবুলি এসে বসল। ওদের ছবি তুলে উদ্যান থেকে বের হতে যাব এমন সময় লেকের পাড়ে দেয়ালের ওপর একজোড়া সাদা-কোমর মুনিয়া এসে বসল। ক্যাম্পাসে এই প্রজাতির পাখি প্রথম দেখলাম। খানিকটা সামনে এগোতেই পাখি দুটি উঠে চলে গেল।
লেকের শেষ মাথায় দেয়ালের পাশ ঘেঁষে একটি বড় মরা গাছ। সে গাছের শাখায় বসে একটি মাছরাঙা শিকারের আশায় এক দৃষ্টিতে লেকের পানির দিকে তাকিয়ে আছে। সেই গাছের অন্য দুটি ডালে জলপাই-সবুজ রঙের কবুতর আকারের দুটি পাখি বসে আছে। পাখিগুলোর পা ও ঠোঁট হলুদ। পাখিগুলোকে চিনতে অসুবিধা হলো না। আগেও ক্যাম্পাসে এই পাখিদের দেখেছি। দুবার ওদের দুটি ছানা উদ্ধার করেছিলাম। তবে প্রথমবার উদ্ধার করা ছানাটিকে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু দ্বিতীয়টিকে ওর মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলাম। বহুদিন পর পাখিগুলোকে ক্যাম্পাসে দেখে পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
সবুজ এই পাখি দুটি এ দেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক ‘কবুতর বটকল’। এ পাখি হরিতাল, বড়া হরিয়াল, হলদে পা হরিয়াল বা হলদে পা সবুজ কপোত নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে একে বলে হরিয়াল। ইংরেজি নাম Yellow-Footed Green Pigeon বা Yellow-legged Green Pigeon। কোলাম্বিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Treron phoenicoptera (ট্রেরন ফিনিকপটেরা)। বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল থেকে পুরো ভারত হয়ে নেপাল, ভুটান, দক্ষিণ চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত এদের বিচরণ রয়েছে।
বটকল বড় আকারের বুনো পায়রা। এদের আয়ুষ্কাল চার থেকে পাঁচ বছর। প্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেহের দৈর্ঘ্য ৩৩ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ২২৫ থেকে ২৬০ গ্রাম। এদের পিঠ হালকা ধূসর-সবুজ। মাথা ধূসর। কপাল ও গলা হালকা সবুজাভ-হলুদ। ঘাড়ে লালচে ছোপ ও ডানায় সবুজাভ-কালোর ওপর হলদে টান রয়েছে। বুকের নিচ, পেট ও তলপেট ধূসর। কাঁধে এক ফালি হালকা বেগুনি রং থাকে। লেজের ওপরের অংশের গোড়ায় জলপাই-হলদে রিং বা বলয় থাকে। চোখ নীল ও চোখের বাইরের চামড়া গোলাপি। চঞ্চু হালকা সবুজাভ। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল চকচকে হলুদ। নখ কালো। পায়রা পায়রির থেকে কিছুটা বড় ও উজ্জ্বল। অপ্রাপ্তবয়স্ক বটকল দেখতে বড়দের মতো হলেও তাদের কাঁধে বেগুনি রঙের ফালি থাকে না।
বটকল মূলত আর্দ্র পাতাঝরা বন, কৃষিজমি, বাগান প্রভৃতি এলাকায় বাস করে। অর্থাৎ যেখানে ছোট ছোট নরম ফলের গাছ যেমন- বট, পাকুর, খোকসা, জগডুমুর, উড়ি আম, বকুল, বউলা গোটা ও এজাতীয় গাছ আছে, সেখানে এরা বাস করে। এদের সচরাচর ঝাঁকে দেখা যায়। এক ঝাঁকে ৫ থেকে ২০টি বটকল থাকে। এ পাখি সকাল ও গোধূলিতে বেশি তৎপর থাকে। বেশ নরম কণ্ঠে শিস দেওয়ার মতো করে ডাকে।
মার্চ থেকে জুন মাস এদের প্রজননকাল। বনের পাতাপূর্ণ ও গ্রামের ঘন গাছপালাপূর্ণ এলাকার গাছে কয়েকটি কাঠিকুটি জড়ো করে ছোট্ট ও হালকা ধরনের বাসা বানায়। পায়রি তাতে এক থেকে দুটি চকচকে সাদা রঙের ডিম পাড়ে। পায়রা-পায়রি উভয়েই ডিমে তা দেয়। ২০ থেকে ২৪ দিনে ডিম ফোটে ছানা বের হয়। পায়রা দুধ খাইয়ে ছানাদের বড় করে তোলে। ছানারা ১০ থেকে ১৩ দিনে উড়তে শেখে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ