১৩ বছর আগের ঘটনা। দুর্লভ ও বিরল পাখির প্রজনন প্রতিবেশের ওপর গবেষণার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জীবন চন্দ্র দাস ও তৈমুর ইসলামকে নিয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বিভিন্ন স্পটে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ভোর থেকে উদ্যানের বিভিন্ন স্পটে ঘুরতে ঘুরতে দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ বনের মাঝামাঝি স্থানে লম্বা লেজের সবুজ বনকোকিলের দেখা পেয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু মাত্র দু-তিনটি ছবি তোলার সুযোগ দিয়েই সে ঝোপের মধ্যে হারিয়ে গেল।
শীতের দুপুর। চমৎকার মিষ্টি রোদ। আশপাশে প্রচুর বুনো ফুলগাছ। গাছে রঙিন রঙিন ফুল। আর ফুলে ফুলে রঙিন সব প্রজাপতির মেলা যেন বসেছে! একের পর এক ছবি তুলেও শেষ করা যাচ্ছে না। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে কয়েক শ ছবি তুললাম। সাদা-কালো-হলুদ-নীল রঙের পতঙ্গগুলোর ছবি তুলতে তুলতে যেন চোখ ধাঁধিয়ে গেল! বিকেলে হোটেলে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা সারলাম।
সন্ধ্যায় ক্যামেরা নিয়ে বসলাম সারা দিনের তোলা ছবি দেখার জন্য। একের পর এক ছবি দেখছি আর রঙিন রঙিন পতঙ্গে বিমোহিত হচ্ছি। দেখতে দেখতে এক সময় একটি হলুদ প্রজাপতির ওপর চোখ আটকে গেল। হঠাৎ দেখায় সাধারণ হলুদ প্রজাপতি মনে হলেও ভালো করে লক্ষ্য করতেই ওকে চিনে ফেললাম। যদিও এটি দুর্লভ বা বিরল নয়, তবে আমার কাছে ওর খুব বেশি ছবি নেই।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের এই পতঙ্গটি এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান প্রজাপতি ত্রিঅঙ্ক গোধূম। আমাদের আশপাশের বাগানে বা ঘাস লতাপাতায় সব সময় যে হলুদ প্রজাপতিটি দেখি সেই তৃণ গোধূমের (Common Grass Yellow) মতোই আরেকটি প্রজাতি। ইংরেজি নাম Three-spotted Grass Yellow। পিরিডি (Pieridae) গোত্রের পতঙ্গটির বৈজ্ঞানিক নাম Eurema blanda (ইউরিমা ব্লান্ডা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মায়ানমারে দেখা মেলে।
ত্রিঅঙ্ক গোধূম মাঝারি আকারের প্রজাপতি। ডানার দৈর্ঘ্য ৪০-৪৫ মিলিমিটার। ডানার ওপরটা গাঢ় লেবু-হলুদ; তার ওপর থাকে নানা আকারের দাগছোপ। ডানার নিচটা হলুদ ও তাতে থাকে মরচে রঙের দাগছোপ। এই দাগছোপগুলো পরিবর্তনশীল হলেও সামনের ডানার খোপে তিনটি সন্দেহাতীত কালো ফুটকি রয়েছে। এ ছাড়া পেছনের ডানার ৭ নম্বর অংশের গোড়ায় একটি কালো দাগ থাকে।
প্রজাপতিটির দুটি রূপ রয়েছে, শুকনো ও আর্দ্র মৌসুম রূপ। শুকনো মৌসুম রূপের ডানার নিচে মরচে রঙের দাগছোপগুলো স্পষ্ট হলেও আর্দ্র মৌসুমে তেমন স্পষ্ট নয়। ডানার ওপরটা হুবহু তৃণ গোধূমের মতো। পুরুষের সামনের ডানার নিচে পক্ষমূলের কাছে অত্যন্ত অস্পষ্ট ও সরু যৌন ফিতে থাকে।
এটি দেশব্যাপী বিস্তৃত হলেও তৃণ গোধূমের চেয়ে কম চোখে পড়ে। সচরাচর চিরসবুজ ও পাতাঝরা বন, বাগান, ঝোপঝাড়, পার্ক, শহর-বন্দর-গ্রাম ইত্যাদিতে দেখা যায়। স্বভাবে কিছুটা তৃণ গোধূমের মতো, তবে মাটির কাছাকাছি না উড়ে অনেক ওপরে উড়ে। খাদ্য ও বিশ্রামের সময় ভূমির স্তরে গাছপালায় নামে। ফুল ও ভেজা জায়গায় বসে।
ত্রিঅঙ্ক গোধূম কৃষ্ণচূড়া, খৈইয়াবাবলা, সোনালু ও এ জাতীয় অন্যান্য গাছে জীবন চক্র সম্পন্ন করে। স্ত্রী প্রজাপতি এসব গাছের পাতার ওপর দিকে গুচ্ছাকারে ২০-৪০টি টাকু আকারের লম্বাটে সাদা রঙের ডিম পাড়ে, যা দৈর্ঘ্যে ১.৩-১.৪ মিলিমিটার হয়। ডিম থেকে শুককীট বের হতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। সদ্য ফোটা সাদা রঙের শুককীটগুলো গড়ে ১.৭ মিলিমিটার লম্বা হয়, যার মাথা হয় কালচে।
শুরুতে শুককীটের রং সাদা থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা হলুদাভ সবুজ হতে থাকে। শুককীট পোষক গাছের পাতা খেয়ে ৯.০-১০.৫ দিনে ২৬-২৮ মিলিমিটার লম্বা হয়। এরপর মাত্র ১২ ঘণ্টায় মূককীটে পরিণত হয়। শুরুতে মূককীটের রং হলুদ হলেও ৪ দিনে এটি গাছের মরা পাতার রং ধারণ করে এবং পরের দিন শক্ত খোলসটি কেটে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি বেরিয়ে আসে। ডিম ফোটা থেকে পুরো জীবন চক্র সম্পন্ন করতে গড়ে ২৭ দিন সময় লাগে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং
অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়