দশ বছর আগের কথা। বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তিন দিনের সফরের শেষ দিন বিকেলে বনের কাঁঠালকান্দি অংশে একপলকের জন্য নীল রঙের একটি পাখি দেখলাম। কিন্তু ক্ষণিকের এই অতিথি ছবি তোলার সুযোগ না দিয়েই গহিন বনে হারিয়ে গেল। এরপর পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে পাখিটিকে কোথায় না খুঁজেছি, কিন্তু দেখা পাইনি। ২০২১ সালের নভেম্বরে পাখিটির খোঁজে জুড়ির মুড়াছড়া ইকোপার্ক ও সাগরনাল চা-বাগানে যাই; কিন্তু ফলাফল একই। এরপর ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি আবারও সাগরনাল বন বিটের নাম না জানা এক পাহাড়ে গেলাম। পাহাড়ের ওপর শতবর্ষী এক পাঁকুড়গাছের ফল পাখিটির অত্যন্ত প্রিয়। এর আগে যারাই ওখানে গিয়েছেন, তারাই পাখিটিকে সেই গাছে দেখেছেন। কিন্তু সেদিন সকালে সেই গাছে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও পাখিটিকে আসতে দেখলাম না।
দুপুর ১২টার দিকে পাহাড় থেকে নেমে ছড়ার দিকে গেলাম। ছড়া ও চা-বাগানের আশপাশে ঘোরাফেরা করে তেমন কোনো পাখির দেখা না পেয়ে বেলা ৩টা নাগাদ আবারও পাহাড়ে উঠলাম। এবার পাঁকুড়গাছটিতে প্রচুর পাখির আনাগোনা দেখলাম; পাখির মেলা বসেছে যেন! কাজেই বিরামহীনভাবে ক্যামেরার শাটারে ক্লিক করে গেলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা পর বহুপ্রতীক্ষিত সেই নীল রঙের একটি পাখি এসে ডালে বসল, কিন্তু কয়েকটি ক্লিক করতেই সে উড়ে গেল। আবারও অপেক্ষার পালা। আরও প্রায় আধা ঘণ্টা পর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রথমে একটি পুরুষ ও পরে একটি স্ত্রী নীল রঙের পাখি এসে ফলে ভরা পাঁকুড়গাছে বসল ও ফল খেতে থাকল। ছবি তোলার জন্য এবার বেশ সময় পাওয়া গেল। চমৎকার সব ছবি তুলে পাহাড় থেকে নামলাম।
এতক্ষণ নীল রঙের যে সুন্দর পাখিটির কথা বললাম সেটি এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি নীলপরী। ইংরেজি নাম Asian Fairy Bluebird। আইরেনিডি (Irenidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Irena puella (আইরেনা পুয়েল্লা)। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটিকে দেখা যায়।
নীলপরী মাঝারি আকারের পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ২৪ থেকে ২৭ সেন্টিমিটার। পুরুষ পাখির ওজন ৫৬ থেকে ৭৭ গ্রাম এবং স্ত্রী পাখির ওজন ৫১ থেকে ৭১ গ্রাম হয়ে থাকে। স্ত্রী ও পুরুষের পালকের রঙে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের দেহের ওপরের অংশ অর্থাৎ মাথার চাঁদি থেকে পিঠ হয়ে কোমর পর্যন্ত উজ্জ্বল চকচকে বেগুনি-নীল। লেজ, ডানা ও দেহের নিচের অংশ চকচকে কালো। উভয় ডানার ওপর দুটি করে বেগুনি-নীল ফোটা রয়েছে। চিবুক ও মুখমণ্ডল গাঢ় মখমলে-কালো; লেজতল-ঢাকনি নীলচে। ঠোঁট সোজা ও কালো। অন্যদিকে ডানা ও লেজ বাদে স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের পালক ফ্যাকাশে নীলচে-সবুজ। ডানা ও লেজ ফ্যাকাশে কালো; ডানার প্রান্ত নীলচে-ধূসর। ঠোঁট বাদামি-কালো। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে চোখ গাঢ় লাল এবং পা, পায়ের পাতা ও নখ কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে অনেকটা স্ত্রী পাখির মতো; তবে ওদের ডানা বাদামি।
নীলপরী দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সিলেট বিভাগ) ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম বিভাগ) মিশ্র চিরসবুজ বন ও আশপাশের এলাকায় বাস করে। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা পাঁচ-ছয়টির ছোট দলে থাকে। দিবাচর এই পাখিগুলো মূলত পাকা ফল ও ফুল-ফুলের রস খায়। মাঝেমধ্যে পোকামাকড়ও খায়। এরা সচরাচর ফলদ গাছের ওপরেই ঘোরাফেরা করে। তবে ফল ও পোকমাকড়ের জন্য ঝোপঝাড়েও নামতে পারে। সচরাচর ‘উইট-উইট-উইট…’ শব্দে ডাকে।
জানুয়ারি থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় ভূমি থেকে ২ থেকে ৬ মিটার উঁচুতে গাছের দো-ডালে ঘন পাতার আড়ালে পাতার শিরা ও ক্ষুদ্র মূল দিয়ে মাচা বা পিরিচ আকারের ঢিলেঢালা বাসা বানায়। ডিম পাড়ে দু-তিনটি; রং হালকা সবুজাভ, যার ওপর থাকে গাঢ় বাদামি ছিটছোপ। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও প্রায় দুই সপ্তাহে ডিম ফোটে। ছানারা ১১ থেকে ১৭ দিনে উড়তে শেখে। মা-বাবা উভয়েই ছানাদের যত্ন করে ও খাওয়ায়। বুনো পরিবেশে আয়ুষ্কাল ১০-১২ বছর হলেও আবদ্ধাবস্থায় এরা ১৫ বছরেরও বেশি বাঁচে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও
অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়